আলেকজান্ডার ও এক ভারতীয় ব্রাহ্মণ।

দারায়ুসকে পরাজিত ও হত্যা করে সারা পারস্য নিজের হাতের মুঠোয় এনে আলেকজান্ডার ভারতের দিকে এগিয়ে এলেন। পশ্চিমদিকে হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে ছোট ছোট স্থানীয় রাজ্যগুলোকে জয় করে তিনি তক্ষশীলায় উপস্থিত হলেন। তক্ষশীলা এখনকার দিনে কাবুলের সংলগ্ন অঞ্চল। তক্ষশীলা তখন বৃহত্তর ভারতবর্ষের অঙ্গীভূত ছিল। তক্ষশীলার রাজা তার বশ্যতা স্বীকার করলেন। তক্ষশীলায় আলেকজান্ডার অনেকদিন থেকে তার ভবিষ্যতে সমগ্র ভারতবর্ষ আক্রমণের পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন।

  আলেকজান্ডার এবং তখনকার দিনের গ্রিক ঐতিহাসিকেরা মনে করতেন ভারতবর্ষ ছোট একটা দেশ। যার দক্ষিণের সামান্য অঞ্চল সমুদ্র উপকূলবর্তী। তারা আরও বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষই পৃথিবীর শেষ ভূখন্ড। তিনি ভেবেছিলেন খুব সহজেই বাকি ভারতকে জয় করে নিজেকে বিশ্বের একচ্ছত্র সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ভারতবর্ষের বিশালতা সম্পর্কে তার কোনো ধারনাই ছিল না। 

  তক্ষশীলায় থাকার সময় তিনি দেখলেন তখনকার ভারতে ব্রাহ্মণেরা সমাজের সবচেয়ে ওপরের আসনে ছিল। তারা রাজাকে নিরন্তর পরামর্শ দিতেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন তাদের ক্রমাগত প্ররোচনাতেই কোনো ভারতীয় রাজা তারা যতই ছোট রাজ্যের অধিপতিই হোন না কেন কিছুতেই বিনা প্রতিরোধে তার বশ্যতা স্বীকার করেন নি। গ্রিকরা ভারতের দুই ধরনের ব্রাহ্মণদের কথা বলেছেন। একদল একটানা ৩৭ বছর গুরুগৃহে থেকে শিক্ষালাভ করে তারপর ঘরে ফিরে সংসার ধর্ম পালন করত। তারা সমাজে খুব মর্যাদা লাভ করত এবং রাজার উচ্চপদে নিযুক্ত হত। আমরা জানি তক্ষশীলা তখন ভারতবর্ষের প্রধান শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নিজে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

  আরেক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন যাদের বলা হত শ্রমণ। তাদের মধ্যে কেউ পাহাড়ে তপস্যা করত। কেউ নগ্ন হয়ে বনে থেকে কঠোর তপস্যায় জীবন কাটাত। তক্ষশীলায় এসে আলেকজান্ডার এই নগ্নপ্রায় ব্রাহ্মণদের সংস্পর্শে আসেন। আলেকজান্ডার জানতে পারেন এরা সম্পূর্ণ আসক্তিশূন্য অবস্থায় সারা জীবন তপস্যা করে অতিবাহিত করেন। আলেকজান্ডার তার গুরু অ্যারিস্টটলের কাছ থেকে দর্শনের পাঠ নিয়েছিলেন। এই নগ্ন তপস্বীদের দেখে সম্ভবত তার গ্রিসের আরেক বিখ্যাত ‘স্টইক দার্শনিক’ ডায়োজেনিসের কথা মনে হয়েছিল। আলেকজান্ডার ম্যাসিডোনিয়ার রাজা হবার পর সবার মুখে ডায়োজেনিসের খুব প্রশংসা শুনতেন। তার একদিন ইচ্ছে হল দার্শনিকের সাথে দেখা করার। সম্রাট ডায়োজেনিসের কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি একটা বড় কাঠের পিঁপের মধ্যে বসবাস করেন। তিনি খুব বিনীতভাবে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি আপনার জন্য কিছু করতে পারি? আমি নিজেকে তাহলে ধন্য মনে করব।” ডায়োজিনিস তাকে বলেন, ‘আপনি অনুগ্রহ করে একটু সরে দাঁড়ান তাহলেই হবে। আপনি ওখানে দাঁড়ানোয় আমার ঘরে রোদ আসছে না।’

  পার্থিব সব ভোগসুখ ছেড়ে মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকে সম্রাটের মনে তাই নিয়ে জানার অপার কৌতূহল। তাই তিনি সৈন্যদের পাঠিয়ে সেই নগ্ন তপস্বীদের দরবারে ডেকে পাঠালেন। তারা কেউ তাদের সঙ্গে কথাই বলল না। সম্রাট তখন তার বন্ধু অনেসিক্রিটাসকে তাদের ডেকে আনতে পাঠালেন। তিনি দিয়ে দেখলেন সেই প্রচন্ড গরমের দিনে ১৫ জন নগ্ন সাধু তপ্ত পাথরের ওপর বসে তপস্যা করছেন। অনেসিক্রিটাস বললেন, ‘মহান আলেকজান্ডার, জিউসের সন্তান, স্বয়ং ঈশ্বর, তোমাদেরকে দেখা করতে বলেছেন। উনি তোমাদের তপস্যা সম্পর্কে জানতে চান’। তাদের মধ্যে একজন বললেন, ‘মাথায় শিরস্ত্রাণ, গায়ে বর্ম, পায়ে জুতো পায়ে কেউ আমাদের সাধনার খোঁজ পাবে না। সম্রাট যদি সত্যিই তা জানতে চান তবে তিনি নগ্ন হয়ে এই গরম পাথরের ওপর বসে আমাদের সাথে তপস্যা করুন’।

  আলেকজান্ডার এই কথা শুনে অত্যন্ত অপমানিত হয়ে তক্ষশীলার রাজা মৌসিকানোসকে তার ইচ্ছের কথা বলেন। রাজা ক্যালানাস(গ্রিক) নামে এক ব্রাহ্মণকে তার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করেন। ক্যালানাসের আসল কি নাম ছিল তা জানা যায় না। তবে মনে হয় আলেকজান্ডার তাকে ‘kale!’ বলে সম্বোধন করেছিলেন- গ্রিকভাষায় যার অর্থ ‘স্বাগত বন্ধু!’ তার থেকেই তার নাম হয় ক্যালানাস। ক্যালানাসও তার সঙ্গে সম্রাটের সাক্ষাতের একটাই শর্ত রাখেন যে সম্রাটকে তার সাথে দেখা করতে হলে নগ্ন হতে হবে। পৃথিবীবিজয়ী আলেকজান্ডার নগ্ন হয়েছিলেন কিনা আমরা জানি না তবে তার সাথে ক্যালানাসের পরবর্তীকালে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার থেকে মনে হয় তিনি হয়ত নগ্ন হয়েই সাক্ষাত করেন।

  ক্যালানাস সম্রাটকে তার গুরু দ্যান্ডানিস বা দন্ড-স্বামীর কথা বললে তিনি তার কাছেও অনেসিক্রিটাসকে পাঠালেন। তিনি গিয়ে দেখেন গভীর জঙ্গলের মধ্যে দন্ড-স্বামী সামান্য কয়েকটা পাতার লজ্জাবস্ত্র পরে তপস্যা করছেন। তিনি তাকে সেই একই কথা বললেন যা আগের ব্রাহ্মণদের বলেছিলেন। তিনি আরও বললেন যে আলেকজান্ডার তাকে উপহার দিতে চান। তিনি সম্রাটের কাছে কী প্রত্যাশা করেন? জবাবে দন্ড-স্বামী বললেন, ‘আলেকজান্ডার ঈশ্বর নন কারণ তিনি অমর নন। তার কাছে আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই, তার প্রতি আমার কোনো ভীতিও নেই। তিনি আমাকে যা দিতে চান তা আমার কাছে অর্থহীন। এই পাতার আচ্ছাদন এটাই আমার ঘর। এই ফলে শোভিত গাছ এরাই আমাকে আহার্য দেয়। এইটুকুই আমার যথেষ্ট। আমার সারাদিনের শেষে সুন্দর ঘুম হয়। তিনি আমাকে সোনাদানা দিলে আমার ঘুমের ব্যঘাত হবে। ব্রাহ্মণেরা যেমন অর্থ চায় না তেমনই মৃত্যুকেও ভয় করে না। মৃত্যু আমাদের কাছে কাঙ্খিত। কারণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা এই নশ্বর দেহের মায়া কাটিয়ে পরলোকে যেতে পারি’।

  তবে ক্যালানাসের সঙ্গে সম্রাটের বন্ধুত্ব হয়। তিনি তখন বৃদ্ধ। তার ৭২ বছর বয়স। আলেকজান্ডার তাকে ম্যাসিডোনিয়ায় নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করেন। ক্যালানাস রাজি হন। তার সঙ্গী ব্রাহ্মণেরা তাকে বারবার নিরস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেন তিনি আলেকজান্ডারের সাথে ফিরে গেলেন তা কেউ বুঝতে পারেন নি।

  পুরুকে পরাজিত করে তার সঙ্গীরা ভারতবর্ষের দিকে এগিয়ে যেতে অস্বীকৃত হলে আলেকজান্ডার পারস্যের পথে ফিরে চললেন। ক্যালানাস তার সঙ্গে রওনা হলেন। আলেকজান্ডারের সাথে মতপার্থক্য হলে তার প্রধান সেনাপতিরা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেতেন শাস্তির ভয়ে। কিন্তু ক্যালানাস মুখের ওপরে আলেকজান্ডারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতেন। ক্যালানাস ছিলেন সৎ ও সাহসী ভারতীয়দের প্রতিভূ। এই সময় আলেকজান্ডার তার এগারো বছরের সামরিক জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্তটি নিলেন। সম্ভবত ভারত আক্রমণে অনাগ্রহী সৈন্যদের একরকম শাস্তি দেবার জন্যই জেড্রাসিয়ান মরুভূমি পার হয়ে পারস্যের দিকে যাত্রা করলেন। এই যাত্রার কিছু আগে  ক্যালানাস একটা পুরনো জড়ানো চামড়া রাস্তার ওপরে ফেলে তার দুপাশে পা দিয়ে দেখালেন যে চামড়া অন্যদিকে উঠে পড়ছে, কিন্তু মাঝখানে পা দিলে সেটি মাটিতে চেপে থাকছে। ক্যালানাস তাকে বোঝালেন রাজ্য শাসন করতে হলে সাম্রাজ্যের প্রান্তে বসে না থেকে কেন্দ্রে বসে শাসন করতে হবে।

  জেড্রাসিয়ান মরুভূমির (বর্তমান মাকরান উপকূল) ওপর দিয়ে যেতে গিয়ে প্রচন্ড গরম ও জলকষ্টে আলেকজান্ডারের প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্য মারা গিয়েছিল। দুমাস বহুকষ্ট সহ্য করে সম্রাট ও তার ভগ্নহৃদয় সেনারা ৩২৩ খ্রীঃপূঃ বর্তমান ইরানের সুসাতে ফিরে এলেন। বিগত দু-মাসের প্রচন্ড কষ্টে বৃদ্ধ ক্যালানাসের শরীর ভেঙে পড়েছিল। তিনি আলেকজান্ডারের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রার্থনা করলেন। তিনি চাইলেন আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করবেন। আলেকজান্ডার কিছুতেই রাজি না হলে তিনি বললেন যেহেতু তার এই অবস্থায় বেঁচে থাকার অর্থ অন্যের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া তাই তিনি এই উপায়ে রাজি না হলে তাকে মৃত্যুর অন্য উপায় বেছে নিতে হবে।

  আলেকজান্ডার বিষন্নমনে সম্মত হলেন। তার স্বেচ্ছামৃত্যুর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিলেন তার অন্যতম অনুগত সেনানায়ক টলেমিকে। ব্রাহ্মণের জন্য বিরাট চিতা প্রস্তুত করা হল। চিতাকে অনেক সোনা ও মসলিন দিয়ে সাজানো হল। ক্যালানাস এত অসুস্থ ছিলেন যে ঘোড়ায় চড়ে আসতে পারলেন না। তাই তাকে ডুলি করে চিতার কাছে নিয়ে এলে তিনি কোনোমতে চিতায় ঊঠে বসলেন। তারপর সব সোনা, রত্ন ও বস্ত্র সেখানে উপস্থিত সৈন্যদের বিলিয়ে দিলেন। হাসিমুখে বললেন, কেউ যেন তার মৃত্যুতে শোক না করেন। তার মৃত্যুকে যেন আনন্দময় ঘটনা বলেই দেখা হয় এবং উৎসব পালন করা হয়। তার মৃত্যুর সময় আলেকজান্ডার উপস্থিত থাকেন নি। ব্রাহ্মণ সকলকে বললেন, ‘সম্রাটকে বোলো আমার জন্য দুঃখ না করতে। আমি ব্যাবিলনে তার সাথে আবার দেখা করব’।

  এই বলে তিনি চিতায় শুয়ে নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে দিলেন। চিতায় আগুন ধরানো হল। দাউদাউ করে চিতার আগুন তাকে পুড়িয়ে দিল। ব্যথা ও বেদনায় তার শরীরে এক চিলতে নড়াচড়াও হয় নি।

  ক্যালানাস যখন মৃত্যুর ঠিক আগে ভবিষ্যতবাণী করে গেলেন যে ব্যাবিলনে তিনি আলেকজান্ডারের সাথে দেখা করবেন তখন কিন্তু সম্রাটের ব্যাবিলন যাবার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। ক্যালানাসের মৃত্যুর ঠিক একবছর পরে ব্যাবিলনে আলেকজান্ডার মারা যান। ক্যালানাসের মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন। সেখানে মদ খাবার প্রতিযোগিতা হয়। যারা সেই প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায়।

One thought on “আলেকজান্ডার ও এক ভারতীয় ব্রাহ্মণ।

  • August 6, 2020 at 2:54 pm
    Permalink

    Great power packed writings, very informative. many thanks for this.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *