আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগার

[ এখনকার দিনের বেড়ানোর জায়গার তো আমরা অনেকেই অনেক বিবরণী লিখে থাকি। যদি অতীতের কোনো জায়গায় আমরা পৌঁছে যেতে পারি সেখানকার ইতিহাস আমাদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। ভাবছি তেমনই কোনো কোনো ঐতিহাসিক স্থান যার অনেককিছুই কালের গ্রাসে হারিয়ে গেছে তাদের নিয়ে কিছু লেখা হলে কেমন হয়? আজ তার প্রথম কিস্তি শুরু করলাম। ]

ভাষাচার্য সুনীতিকুমার তার এক প্রবন্ধের এক জায়গায় বলেছিলেন তাকে যদি বলা হয় তিনি ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর অন্য কোন দেশে জন্মগ্রহণ করতে চান তবে তিনি প্রাচীন গ্রিকদেশে জন্মগ্রহণ করতে চাইবেন। যে গ্রিকেরা শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন সবেতেই তাদের শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে আরোহণ করেছিল। এই গ্রিক ঐতিহ্যকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবার বাসনা নিয়ে অ্যারিস্টটলের শিষ্য আলেকজান্ডার ৩৩৪ খ্রীঃপূঃ ম্যাসিডোনিয়া থেকে বেরিয়ে পড়লেন সারা পৃথিবীকে জয় করবেন বলে। কিন্তু দেশে ফেরার পথে ৩২৩ খ্রীঃপূঃ তিনি ম্যালেরিয়ায়(?), বিষ প্রয়োগে(?) মারা গেলেন। অনেকে বলেন এখনকার ইজিপ্টের আলেকজান্দ্রিয়া শহরেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। আলেকজান্ডার মারা গেলে তার দেহরক্ষী টলেমির হাতে আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনভার তুলে দিয়ে যান।
আলেকজান্ডার তার সাথে সৈনিক ছাড়াও অনেক কবি, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের সঙ্গে করে নিয়ে বিশ্বজয়ে বের হয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু রাজ্য জয় করা নয় তার সাথে গ্রিক ঐতিহ্যকেও সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া। এরই প্রভাবে আফ্রিকা, এশিয়া ও ভারতের সংস্কৃতির সাথে গ্রিক সংস্কৃতি মিলনে হেলিনিস্টিক ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। আমাদের ভারতে উত্তর-পশ্চিম অংশের গান্ধার শিল্প এই মিশ্র ঐতিহ্যের প্রভাব।
আলেকজান্ডার তার গুরু অ্যারিস্টটলের জন্য উপহার হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে হাতি নিয়ে যাচ্ছিলেন। কারণ পুরুর সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েই তিনি প্রথম এই হাতি দেখতে পান। সেই হাতি তার মৃত্যুর পরে গ্রিসে পৌঁছেছিল কিনা তা আমি জানি না কিন্তু তিনি তার গুরুর শিক্ষার ঐতিহ্য বহন করে চলেছিলেন। তার ইচ্ছেতেই প্রথম টলেমি শিক্ষাবিদ দিমেত্রিয়াসের সাহায্যে ২৯৫ খ্রীঃপূঃ আলেকজান্দ্রিয়ায় এক পৃথিবীবিখ্যাত পাঠাগার তৈরি করলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সারা পৃথিবীতে যত বই আছে সব বই সেই লাইব্রেরিতে থাকবে। যেহেতু সেই লাইব্রেরির খুব কম সংখ্যক বইই পরবর্তীকালে অবশিষ্ট ছিল তবু অনেকে মনে করেন সেখানে প্রায় চল্লিশ হাজার থেকে চার লক্ষ বই ছিল। কেউ কেউ বলেন সেই সংখ্যাটা প্রায় দুই থেকে সাত লক্ষ।
লাইব্রেরির দুটো অংশ ছিল। একটা মিউজিয়াম অন্যটি সাধারণ পাঠাগার। শুধু পাঠাগার নয় মিউজিয়ামটি তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ গবেষোণারও স্থান হয়ে উঠেছিল। বই সংগ্রহের জন্য দুটি নীতি গ্রহণ করা হয়। প্রথমত বই কেনা হত। দ্বিতীয়টি বড় অদ্ভুত রকমের। তখনকার দিনে আলেকজান্দ্রিয়া নগরীটি ভূমধ্যসাগরের গায়ে থাকার কারণে বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। তাই যেসব জাহাজ মালপত্র নিয়ে নগরীতে নোঙ্গর ফেলত তাদের পরীক্ষা করার পর সৈনিকেরা কোনো বই পেলে তাকে লাইব্রেরিতে নিয়ে আসতেন। সেখানে লিপিকর যারা থাকত তারা সেই বইগুলোকে নকল করে নকল বইটি জাহাজের কাপ্তেনের হাতে তুলে দিত। আসল বইটি তারা লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করত। এভাবে প্রচুর দেশবিদেশের বই তারা সংগ্রহ করেছিল।
মূলত গ্রিক এবং ইজিপ্সিয়ান এই দুটো ভাষার বই লাইব্রেরিতে ছিল। অলংকারশাস্ত্র, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, আইন, ভূগোল, চিকিৎসাশাস্ত্র এসব বিষয়ের বই ছিল সেই লাইব্রেরিতে। এত বই যাতে লোকেরা সহজে খুঁজে পড়তে পারে তার জন্য ক্যালিমিকাস একটি ক্যাটালগ তৈরি করেন। ক্যাটালগ ছিল মোটা মোটা ১২০টা বইয়ের সমষ্টি। ভেবে দেখুন। সেটাই সম্ভবত ছিল পৃথিবীর প্রথম বইয়ের ক্যাটালগ।
মিশরের ঐতিহাসিকেরা সেই সময় মিশরের তিরিশটি রাজবংশের ইতিহাস লিখে রেখে গেছিলেন। আজও ঐতিহাসিকেরা সেই ইতিহাসকে মান্য করেন। প্যাপিরাসের গায়ে কালি দিয়ে সেই বই লেখা হয়েছিল। সেইসব বই সংরক্ষিত ছিল লাইব্রেরিতে। এই সময় গ্রিক অনুবাদকেরা হিব্রু বাইবেলের গ্রিকভাষায় অনুবাদ করেন। দ্বিতীয় টলেমি এই বিরাট কাজের জন্য ৭২ জন অনুবাদককে নিযুক্ত করেন। সেটাই ছিল ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম গ্রিক অনুবাদ। এর নাম ছিল ‘সেপ্টুয়াজিন্ট’। গ্রিক ভাষায় ‘সেপ্টুয়া’ কথার অর্থ সত্তর। পরবর্তীকালে যিশুর জন্মের পর যখন নিউ টেস্টামেন্ট লেখা হল তাকে এর সাথে সংযুক্ত করা হয়েছিল। অনুবাদকেরা মূলত ভাবানুবাদ করেন। আক্ষরিক অনুবাদ করেন নি। তাই তার বিখ্যাত বই ‘দ্য সেলফিশ জিন’-এ জিনের কপি করতে ভুল হওয়ায় মিউটেশন হলে কেমন হয় তা বোঝাতে লেখক সেপ্টুয়াজিন্ট থেকে একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন। সেপ্টুয়াজিন্টরা যখন ভাবানুবাদ করছেন তখন মাতা মেরীর কোলে যিশুকে দেখে সবাই বলছে, দেখ অত সুন্দরী যুবতীর কোলে ঈশ্বরের সন্তান। ‘সুন্দরী’ শব্দের গ্রিক অনুবাদ করা হল ‘ভার্জিন’। পরবর্তীকালে সেই বাইবেল ইংরেজিতে অনুবাদ হলে গ্রিক ‘ভার্জিন’ অর্থে ‘সুন্দরী’র অর্থ পালটে হয়ে গেল ‘কুমারী’। তাই পরবর্তীকালে সেই কুমারী মায়ের লিগাসি সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে যাই হোক এই গ্রিক বাইবেলকেই পরবর্তীকালে বাইবেলের অত্যন্ত মান্য ভাষ্য হিসেবে ধরা হয়। এখনও হয়ে থাকে।
সেই পাঠাগার ছিল বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। সেখানকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন এরাটোস্থেনিস। যিনি ২৩৫ খ্রীঃপূঃ প্রথম সিদ্ধান্ত নিলেন যে পৃথিবীর আকার গোল এবং আলেকজান্দ্রিয়া ও সিয়েন এই শহরদুটোর মধ্যে পোঁতা দুটো লাঠির ছায়ার কৌণিক পার্থক্য বিচার করে তিনি পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করলেন। চল্লিশ হাজার কিলোমিটার। যা বর্তমানে মাপা পৃথিবীর পরিধির প্রায় কাছাকাছি। ভেবে দেখুন এই লাইব্রেরিতে বসে উনি আজ থেকে ২২৫০ বছর আগে পৃথিবীর পরিধি মেপে ফেললেন। শুধু এরাটোস্থেনিস নন। হেরন অব অ্যালেক্স প্রথম স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন। ডায়ানোসিয়াস অব থোরেস ‘পার্টস অফ স্পিচ’ আবিষ্কার করেন। হেরোফিলাস প্রথম বলেন যে হার্ট নয় আমাদের মস্তিষ্কই হল বুদ্ধির জায়গা। অ্যাপোলিনিয়াস ইলিপ্স, প্যারাবোলা, হাইপারবোলা আবিষ্কার করেন। আর্কিমিডিসের কথা তো বাদই দিলাম। ইউক্লিড জ্যামিতির যেসব স্বতসিদ্ধ প্রকাশ করেন তা আজও আমরা গণিতশাস্ত্রে ব্যবহার করি। টলেমি গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে যা পর্যালোচনা করেন তার থেকেই আজকের জ্যোতিষশাস্ত্র গড়ে উঠেছে।
এই পাঠাগারের শেষ আলো ছিলেন হাইপাশিয়া। এক আশ্চর্য মেধাবী নারী পৃথিবী যার কথা ভুলেই গিয়েছিল। তার কথায় পরে আসছি। আগে বলি এই বিখ্যাত এত বড় লাইব্রেরি কিভাবে ধ্বংস হল। ৪৮ খ্রীঃপূঃ জুলিয়াস সিজার ক্লিয়োপেট্রাকে বাঁচাতে আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করেন। তখন রোমান সাম্রাজ্যের শাসন কায়েম হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ায়। সিজার সেসময় বিপদ বুঝে শত্রু জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ল বন্দরের পাশেই অবস্থিত লাইব্রেরির গায়ে। লাইব্রেরির বাইরের অংশ পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। কিন্তু ভেতরের অংশ তখনও অবশিষ্ট ছিল।
রোমান সাম্রাজ্যের টালমাটাল অবস্থায় ৩৫৫ খ্রীঃ আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন হাইপাশিয়া। তার বাবা থেরন ছিলেন তখনকার বিখ্যাত গণিতজ্ঞ এবং জ্যোতির্বিদ। তিনি তার একমাত্র কন্যাকে নিজের সব জ্ঞান উজাড় করে শিক্ষা দিলেন। হাইপাশিয়া অচিরেই প্রজ্ঞায় তার বাবাকে ছাপিয়ে গেলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠাগারে তিনি সারা পৃথিবীর ছাত্রদের গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা দিতেন। গণিতের অসম্ভব অনুরাগী ছিলেন তিনি। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, পিথাগোরাস, টলেমি এদের সবার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি যে নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতেন তাকে বলা হত ‘নিওটলেমিজম’। তিনি গণিতকে চারভাগে ভাগ করেনঃ জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, সঙ্গীত ও পাটিগণিত। এই গণিতের সুত্রেই তার সাথে পরিচয় হয় অরেস্টেসের। অরেস্টেস তাকে প্রেম নিবেদন করেন। কিন্তু তার প্রণয়ে ডুবে গিয়েও তিনি তাকে এই বলে ফিরিয়ে দিলেন যে তিনি বিয়ে করেছেন গণিতশাস্ত্রকে তাই তার পক্ষে অন্য কাউকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। ভাবতে পারছেন। আজ থেকে দু-হাজার বছর আগে যখন নারীরা গন্য হত পণ্য এবং পুরুষের অধিকার হিসেবে তখনকার দিনে অসম্ভব সুন্দরী বিদুষী এক নারী তার প্রণয়ীকে এমন কথা বলছেন।
এর মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ায় অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। রোমানরা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছেন। হাইপাশিয়া ছিলেন পেগান মতাদর্শে বিশ্বাসী। তিনি বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন শিক্ষা ও বিজ্ঞান সবার ওপরে। তার পরে ধর্ম। তখন সিরিল ছিলেন রোমান নির্বাচিত আলেকজান্দ্রিয়ার আর্চবিশপ। হাইপাশিয়ার প্রণয়ী এবং গুণমুগ্ধ অরেস্টেস তখন আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর। সিরিল তাই হাইপাশিয়াকে বেছে নিলেন আক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে। তিনি হাইপাসিয়াকে ডাইনি বললেন। বললেন তার পেগান মতামত খ্রিষ্ট ধর্মের পরিপন্থী। তার নির্বাচিত গুন্ডারা একদিন যখন তিনি লাইব্রেরিতে পড়াতে যাচ্ছিলেন তাকে রথ থেকে নামিয়ে নগ্ন করে অস্ত্র দিয়ে তার চামড়া শরীর থেকে আলাদা করে তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল। তার দেহাবশেষ জ্বালিয়ে দিল। তার সব লেখা বইপত্র পুড়িয়ে নষ্ট করে তাকে ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিল।
এই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরে হাইপাশিয়ার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে হীনমন্যতা ও হতাশা গড়ে ওঠে। সিরিলকে পোপ তার মহান কাজের জন্য ‘সেন্ট’ ঘোষণা করেন। পোপের নির্দেশে পেগান সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত পাঠাগারকে দ্বিতীয়বারের জন্য পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কেউ কেউ অবশ্য বলেন পরবর্তীকালের এক মুসলিম শাসকের হাতেই এই লাইব্রেরির সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন হয়।
খুব কম সংখ্যক মহামূল্যবান পুঁথিই এরপর বেঁচে ছিল। সফোক্লিসের ১২৩টি নাটকের মধ্যে মাত্র সাতটি অবশিষ্ট ছিল যার মধ্যে একটি ছিল ‘ইডিপাস রেক্স’। ইউক্লিড, এস্কাইলাস, ইউরিপিদিস এদের বহু মহামূল্যবান বই চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। আলেকজান্দ্রিয়ার এই অসাধারণ লাইব্রেরির অন্তিম ইতিহাস আমাদের এটাই জানিয়ে দেয় যে অজ্ঞানতা, ধর্মান্ধতা চিরকাল জ্ঞানের শত্রু। স্বাধীন মত প্রকাশের ও যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত জানানোর অধিকারকে কেউই কোনোদিন স্বীকার করে নি। তার পরিণামকেও ইতিহাস ভোগ করেছে। আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠাগারের পতনের পর ইউরোপে হাজার বছরের অন্ধকার যুগের সূচনা হল। এই সময় আরব ও হিন্দু বৈজ্ঞানিক এবং জ্যোতির্বিদরা সারা পৃথিবীতে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবার ভার গ্রহণ করলেন।

2 thoughts on “আলেকজান্দ্রিয়া পাঠাগার

  • August 2, 2020 at 4:12 am
    Permalink

    Very nice for me.

    Reply
    • August 2, 2020 at 7:57 am
      Permalink

      সঙ্গে থাকবেন।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *