‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’

আমি ছোটবেলা থেকেই একটা কথা শুনে এসেছি যে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীবিকার নাম পতিতাবৃত্তি বা দেহব্যবসা। সেটা কত পুরনো? কতদিন আগেকার? পতিতাবৃত্তির সাথে পুরুষতন্ত্রের কথা খুব সরাসরি যুক্ত। নারীকে পন্য করে তাকে বেশ্যাবৃত্তিতে বাধ্য করা এসবই যে পুরুষতন্ত্রের নারীর ওপর অবমাননা ও অত্যাচারের উদাহরণ এসব মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেই। কিন্তু আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে ব্যাপারটা কি সত্যিই এমন ছিল? এখনকার দিনের সমাজেও কি তার কিছু প্রভাব নেই?

  কোনো কোনো পন্ডিত দাবি করেছেন যে প্রাচীনযুগের কৃষিভিত্তিক সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। মানুষ যখন শিকার ছেড়ে ধীরে ধীরে কৃষিকেই তার প্রধান জীবিকা বলে বেছে নিতে শুরু করেছে তখন থেকেই সমাজে নারীর গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কেউ কেউ আবার এও বলেছেন কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার। প্রথম দিকে ফসল বপন থেকে ফসল তোলা সব কাজই মেয়েরা করতেন তাই চাষবাসের বিরাট ভার মেয়েদেরই নিতে হত। পরে লাঙ্গল আবিষ্কারের পর এবং কৃষিকেই প্রধানতম অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করার পর চাষবাসে পুরুষ যুক্ত হয় ও তার প্রাধান্য বাড়ে। তাই প্রাচীনকাল থেকেই কৃষির সাথে মানুষ নারীকেই অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ভেবে এসেছে।

  প্রাচীন সব দেবীরাই তাই মাতৃদেবী। পুরুষদেবতার সংখ্যা হাতে গোনা। প্রত্যেক দেবীর সাথে এক দেবতাকে আরও পরে যুক্ত করা হয়েছে- কিন্তু সেই দেবতা গৌণ, একই সাথে দেবীর পুত্র, প্রেমিক এবং স্বামী। মনে রাখতে হবে সেই দেবী কিন্তু ভার্জিন, অক্ষতযোনি; তাঁর মানসকল্পনায় দেবতার জন্ম। তাই দেখি আফ্রিকায় তানিত ও তার ছেলে, ইজিপ্টে আইসিস ও হোরাস, এশিয়া মাইনরে সিবিলি ও আটিস, ব্যাবিলনে ইশতার ও তাম্মুজ, গ্রিস ও ক্রিটে রিয়া ও জিউস, আফ্রোদিতি ও আদোনিস, আমাদের ভারতে পৃথ্বী ও দ্যাবা আরও পরে শক্তি ও শিব। তাই প্রাচীন পৃথিবীতে সর্বত্র দেবীর মন্দির ও তার পূজা।

  কৃষির সাথে যেমন নারীকে সংযুক্ত করা হয়েছিল তেমনই যৌনক্রীড়াকে ফসল বপন ও তোলার সাথে অভিন্নভাবে দেখা হত। তাই সকল আদি দেবীরাই মাতৃদেবী হলেও তার আদপে শস্যদেবী। যৌনক্রীড়া এক অর্থে ফার্টিলিটি কাল্ট। তাই যৌনক্রীড়ার প্রকাশ দেখি প্রাচীন সভ্যতায়। হেরোডোটাস তার ‘মেসোপটেমিয়া’ নামে বইতে লিখেছেন প্রাচীন সুমেরে মাইলিট্টা দেবীর মন্দিরে প্রত্যেক মেয়ে সারা জীবনে অন্তত একবার এক অচেনা মানুষকে দেহদানে বাধ্য থাকত। সেই পুরুষ নারীর কোলে মুদ্রা ছুঁড়ে দিত, তারপর তাদের যৌনমিলন হত। সেই অর্থ যা কিনা ‘তার দেহের প্রথম ফল’ তা দেবতাকে উৎসর্গ করতে হত।

  সাইপ্রাসে যুবতী মেয়েরাও বিয়ের আগে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য থাকত এবং উপার্জিত অর্থের কিছুটা দেবী ভেনাসকে দান করত যার বিনিময়ে তিনি তার ভবিষ্যতের সতীত্ব রক্ষা করবেন। সিরিয়ার হেলিওপলিসে এই পতিতাবৃত্তি এত প্রবল হয়ে ওঠে যে রোমান সম্রাট কন্সট্যান্টাইন আইন করে তাকে নিষিদ্ধ করেন। লিডিয়াতে এই পতিতাবৃত্তি গ্রিক-রোমান সভ্যতার অনেক পরের দিকেও টিকে ছিল। দ্বিতীয় শতকের লিডিয়ার মন্দিরের গায়ে এক লেখ পাওয়া গেছে যাতে অরেলিয়া আমেলিয়া নামে এক নারী গর্বের সাথে স্বীকার করছে যে সেই মন্দিরে সে, তার মা এবং তার ঠাকুমা সকলেই দেহদান করেছে।

  প্রাচীন যুগের ব্যাবিলনিয়া ও তার সংলগ্ন এলাকার এক মহাদেবী ছিলেন ইশতার। পরবর্তী সময়ে অনেক দেবী এই মহাদেবীর সাথে মিশে গেছেন। এই দেবীর কিছু সুন্দরী সাঙ্গোপাঙ্গো ছিল যারা মূলত ছিল পতিতা। এই পবিত্র বারাঙ্গনাদের বলা হত ‘ইশতারিতাম’, এরা মন্দিরেই থাকত এবং পতিতাবৃত্তি করত। গিলগামেশ কাব্যেও আমরা এদের দেখতে পাই। প্রাচীন মিশরে তৃতীয় আমেনহোটেপের থিবস নগরীতে যে বিরাট মন্দির ছিল তাতে দীর্ঘদিন ধরে এমন পতিতাবৃত্তি চলে এসেছিল।

  আমাদের ভারতের দক্ষিণের রাজ্যের মন্দিরে বহু প্রাচীনকাল থেকেই যে দেবদাসী প্রথা চলে আসছিল যা ক্রমে আমাদের বাংলায়ও ছড়িয়ে পড়ে, তা যে মূলত সেই ‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’ এই ধারণা থেকেই এসেছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ভারতেও এই দেবদাসী প্রথা কত প্রাচীন তার একমাত্র নিদর্শন খ্রীস্টিয় তৃতীয় শতকের রামগড় পর্বতের পাদদেশে যোগীমারা মন্দিরের গায়ে লিখিত এক ব্রাহ্মী ভাষায় লেখা এক শিলালিপিঃ ‘সুতনুকা নামে দেবদাসী। তাকে কামনা করেছিল বারাণসীবাসী দেবদত্ত নামে রূপদক্ষ’।

  আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন প্রথমে এইসব নারীরা দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের পূজারিনী ছিলেন পরে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে তারা দেবদাসীতে পরিণত হন। দ্রাবিড় সভ্যতা যা অনেকে মনে করেন তা ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত তাদের দেবী ও মন্দিরে ‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’ যে সেমিটিকদের মন্দিরে নারীর বাধ্যতামূলক যৌনক্রীড়া এমন একটা ধারণা থেকেই এসেছে তা ভাবা বোধ করি অন্যায় হবে না।

  এখন প্রশ্ন হল এমন একটা প্রথা অতি প্রাচীনকালে কেন চালু হল? তার ভিত্তি কী ছিল? অনেক নারী ও নারীবাদীদের এটা শুনতে খারাপ লাগলেও এটা হয়ত সত্যি যে তখনকার মেয়েরা মন্দিরে ‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’ করে হয়ত লজ্জিত বা অপমানিত হতেন না। স্যার জেমস ফ্রেজার বলেছেন এই ধারা আদপে একটা কৃষিমূলক সংস্কার ছিল। আগেই বলেছি নারী ও পৃথিবী এবং যোনি ও মৃত্তিকাকে অভিন্ন রূপে দেখা হত। ফ্রেজার বলেছেন এটা একটা প্রাচীন জাদুবিশ্বাসের অন্তর্গত ছিল যে শস্যদেবীর মন্দিরে যৌনক্রীড়া করলে সেই বছর ফসল ভাল হবে। তিনি আরও বলেছেন মাইলিট্টা দেবীর মন্দিরে যে অচেনা লোকের সাথে সঙ্গম করা হত সেই ‘অচেনা লোক’টিকে আসলে ঈশ্বরপ্রেরিত দূত বলে ভাবা যেতে পারে। আজকের দিনে একথা আমাদের মেনে নেওয়া কষ্টকর হতে পারে কিন্তু মনে রাখতে হবে আমরা এমন এক সময়ের কথা বলছি যখন প্রধান পুরোহিত রাজা হতেন। রাজাকে দেবতার সাথে অভিন্ন বলে মনে করা হত। তাই দেবতা ও মানুষের সম্পর্ক ভিন্ন ছিল। পৃথিবীতে মানুষ কিছু জাদুবিশ্বাস ও টোটেম প্রথার দ্বারা চালিত হত। কৃষির মত একটা প্রচন্ড অনিশ্চিত জীবিকাতে দেবতাকে সন্তুষ্ট করা ছাড়া প্রাচীন মানুষদের হাতে অন্য কোনো উপায় ছিল না।

  আমরা আজকের দিনেও প্রাচীন জনজাতির মধ্যে সেই কৃষি সম্পর্কিত জাদুবিশ্বাসের প্রভাব লক্ষ্য করে থাকি। আর ক’দিন বাদে তো আমাদের দেবীপক্ষ শুরু হয়ে যাবে। লক্ষ্য করলে দেখবেন এই আমাদের দেবীপূজা কিন্তু শ্রাবণের পর শুরু হচ্ছে শেষ হচ্ছে মার্চ এপ্রিলে। ঠিক সেই সময়টায় যখন আমাদের ফসল বপন ও তোলার মরশুম শেষ হচ্ছে। দুর্গাপূজা দিয়ে শুরু সরস্বতী পূজায় শেষ। মণিপুরের নাগারা আজও ফসল তোলার সময় অশ্লীল আচরণ করে। তারা বিশ্বাস করে এটা একটা তুক যা ফসল ভালো করবে। উড়িষ্যার ভুঁইয়ারা ‘মাঘপোরাই’ বলে এক উৎসব করে শীতকালে যাতে মদ্যপান ও অবাধ যৌনক্রীড়া চলে। আসামের বিঁহু উৎসব আসলে শস্যের উৎসব হলেও এই উৎসবে নারীদের অবাধ সঙ্গমের অধিকার দেওয়া হত। আমাদের হোলি উৎসব আসলে শস্যের উৎসব কিন্তু এই উৎসবে নারী-পুরুষের অবাধ যৌনতার লাইসেন্স প্রাচীনকাল থেকেই দেওয়া হয়েছে। ভারতে আগে অনাবৃষ্টির সময় মেয়েরা নগ্ন হয়ে রাতে শুকিয়ে আসা জমিতে লাঙ্গল যুতে জমিতে লাঙ্গল দেবার অভিনয় করত। ১৯৬৩ সালেও লখনৌতে এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এরকম আরও ভুরিভুরি উদাহরণ দেওয়া যায়।

  এ থেকেই প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায় এই ‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’ আসলে একটা ফার্টিকিটি কাল্ট যা এক জাদুবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই প্রথা এমন সময় গড়ে ওঠে যখন মানুষেরা জানতও না যে সন্তানধারণে নারী ছাড়া পুরুষের আদৌ কোনো ভূমিকা আছে। সন্তান ফসলের মতই ঈশ্বরের দান। কিন্তু এই আদিম প্রথা পরে যখন কৃষিজীবি সমাজে পুরুষতন্ত্র প্রচলিত হল তখন নারীর অবমাননায় দেবদাসী প্রথায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। ‘পবিত্র পতিতাবৃত্তি’ সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য এক জীবিকায় পরিণত হয়।

  যা বললাম কিছু কিছু পন্ডিত এমনটা মনে করেন। এগুলো সবই কল্পনা যা খুব কম পরিমাণ প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এর বিরুদ্ধ মত যে কিছু থাকতে পারে না তা নয় কিন্তু এই মত মোটামোটিভাবে অনেকেই মেনে নিয়েছেন। প্রাচীনযুগের মিথলজি বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের প্রাচীনযুগের মানুষের মনের কাছাকাছি নিজেদের নিয়ে যেতে হবে। পন্ডিতেরা চেষ্টা করেছেন, তবে কাজটি সহজ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *