বাংলার মসলিন (১)

প্রাচীন যুগের যেসব শিল্প নিয়ে আমরা বাঙালিরা আজও গর্ববোধ করতে পারি তার মধ্যে অন্যতম হল মসলিন। সেই শিল্পের কদর ও প্রভাব প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের বেশি কিছু সময় ধরে বর্তমান থাকলেও আজ আশ্চর্যজনকভাবে তা কালের গহ্বরে বিলীন হয়ে গেছে। সেই গৌরবের ইতিহাস আজ খুঁজে পাওয়াও খুব কঠিন। বছর সাতেক আগে যখন মূর্শিদাবাদ বেড়াতে যাই তখন জগৎশেঠের বাড়ি দেখতে গিয়ে সেখানে প্রথম মসলিন দেখতে পাই। তারপর আর কোথাও দেখি নি। স্মৃতিতে অতীতের সেই অতুলনীও শিল্পের নমুনা আমাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। যা কিছু আমাদের শ্রেষ্ঠ আমরা কেন তাকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে পারি না?
মসলিনের নাম কিভাবে হল তাই নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে দুটি মত প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন ইংরেজ বণিকেরা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মসলীপত্তম বা মছলিপত্তন বন্দর থেকে এই কাপড়কে সারা ইউরোপে রপ্তানি করত বলে এর নাম হয়েছে মসলিন। হেনরি ইউল ও এ.সি. বার্নেল মনে করেন ‘মসুল’ শব্দ থেকেই মসলিন কথাটা এসেছে। মসুল ইরাকের শহর। পুরাকাল থেকেই এখানে উৎকৃষ্ট বস্ত্র তৈরি হত। ইউরোপীয়রা সূক্ষ্ম সুতির কাপড়কে মসুলী বা মসুলীন বা মসলীন বলত। সেই থেকেই এর নাম হয় মসলিন। ড. আব্দুল করিম মনে করেন মসলিন শব্দটি ইউরোপীয়। কারণ ইংরেজরা গুজরাট বা গোলকুন্ডায় তৈরি কাপড়কেও মসলিন বলত। আবার কেউ বলেন প্রাচীন কাল থেকেই আরব বণিকেরা তৎকালীন তুরস্কের রাজধানী মসুলনগর বা মসুলে খলিফা ও সুলতানদের কাছে এই বস্ত্র বিক্রি করত বলে এর নাম হয় মসলিন।
এই মসলিন মধ্যযুগে সবচেয়ে বেশি তৈরি হত ঢাকায়। তবে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন বর্তমান বাংলাদেশের ভাওয়াল জঙ্গলে পরিবেষ্টিত কাপাসিয়াই প্রাচীনকালে মসলিন তৈরির আদি কেন্দ্র ছিল। অতি প্রাচীনকাল থেকেই মসলিন বাঙালিদের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান উপাদান ছিল। সমৃদ্ধশালী ব্যাবিলনের অধিবাসীদের মধ্যে মসলিন অত্যন্ত পছন্দের বস্তূ ছিল। মিশরের মমির গায়ে জড়ানো নীল রঙের মসলিন পাওয়া গেছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ওই মসলিন বাংলার কারণ তখনকার দিনে বাঙালি ছাড়া আর কেউ নীলের ব্যবহার জানত না। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে রোমান মেয়েরা মসলিন পড়ে তাদের দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করত। ওই একই সময়ে অজানা গ্রিক বণিকের লেখা ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ বইয়ে বলা আছে মোটা মসলিনকে বলা হত ‘মলোচিনা’। মসৃণ মসলিনকে বলা হত ‘মোনাচি’ আর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কাপড়কে বলা হত ‘গ্যানজেটিক’ বা ‘গঙ্গাজলী’। এই গঙ্গাজলী বা ‘গঙ্গার জল’ শাড়ির কথা বিংশ শতাব্দীতে প্রচলিত ‘সোনাই বিবির পালা’তে প্রত্যক্ষ করা যায়ঃ ‘পরথমে পাইড়াইল শাড়ি ভাইরে/ শাড়ি নামে গঙ্গার জল/ নুখেতে লইলে শাড়ি/ আরও করে টলমল রে/ পানিতে থইলে গো শাড়ি/ শাড়ি পানিতে মিলায়/ হাতেতে লইলে শাড়ি মুইষ্টেতে মিলায়/ মিরতিকাতে লইলে শাড়ি ভাইরে/ পিঁপড়ায় টাইন্যা লইয়া যায় রে’। আজ থেকে দু-হাজার বছর আগে প্রচলিত এক হারিয়ে যাওয়া কাপড়ের নাম আজও লোকের জনশ্রুতিতে মিশে আছে। খ্রীঃপূঃ দ্বিতীয় শতকে গ্রীসদেশের বাজারে ঢাকাই মসলিন বিক্রি হত।
নবম শতকে আরব বণিক সোলেমান তার ‘সিলসিলাত-উত-তাওয়ারিখ’ নামে এক বইয়ে ‘রামী’ নামে এক জায়গার কথা বলেছেন যেখানে ৪০ হাত লম্বা ২ হাত চওড়া কাপড় তৈরি হত যা কিনা আংটির মধ্যে দিয়ে গলে যেত। মনে করা হয় এই রামী বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল ছিল। ১৩০০ সালের মাঝামাঝি মরক্কোর ইবন বতুতা ভারতে এলে সোনারগাঁওয়ের সুতিবস্ত্রের প্রশংসা করেন। ১৪০০ শতকের চিনা লেখকদের রচনায় পি-পো(নানা রঙের ছাপা কাপড়), মান-চে-টি(আদার রঙের হলুদ কাপড়), শা-না-ফু, শা-তা-উল, কি-পাই-লি-তা-লি নামে নানান মসলিনের প্রশংসা আছে। ১৫০০ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগীজ ডুয়ার্টে বারবোসা বাংলাদেশের সুতিবস্ত্রের বিবরণ দিয়েছেন। এস্ত্রাবানতে(সরবন্দ বা শিরস্ত্রাণ?), মাসোনা, দুগজা, চৌতারা, সিনবাফা নামে মসলিনের উল্লেখ করেছেন। ওই শতকের শেষভাগে ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচ এবং আবুল ফজল বাংলার সোনারগাঁওয়ের কাপড়ের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তবে এই উৎকৃষ্ট শিল্পের পলাশীর যুদ্ধের পরই অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং উনিশ শতকের মাঝামাঝি তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলায় প্রায় আঠারো রকম মসলিনের নাম পাওয়া যায়। বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক জেমস টেলরের লেখা থেকে মূলত এইসব মসলিনের নাম পাওয়া যায়। সেইসব মসলিনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেয়া হল-
১। মলবুস খাস বা খাসবস্ত্র- আঠারো সতকে তার নাম হয় মলমল খাস। সবচেয়ে দামি এই মসলিন প্রধানত বাদশাহদের জন্যই তৈরি করা হত। পরের দিকে তা বিদেশেও রপ্তানি করা হত। এটি সাধারণত ১০ গজ লম্বা ও ১ গজ চওড়া হত। কখনই এদের ওজন ৬ বা ৭ তোলার (৬ রতি=১ আনা, ১৬ আনা=১ ভরি=১ তোলা=১১.৬৬ গ্রাম) বেশি হত না। জাহাঙ্গীরের বেগম নুর জাহান একটি ২০ হাত লম্বা মলমল খাসকে পাখির পালকের মত উড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। সপ্তদশ শতকের ফরাসি বণিক ট্যাভার্নিয়ে তার ভ্রমণবৃত্তান্তে বলেছেন ৬০ হাত লম্বা এক মসলিনকে নারকেলের খোলার ভেতরে পুরে রাখা যেত।
২। ঝুনা- হিন্দি ‘ঝিনা’ বা সূক্ষ্ম থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। এটি ২০ গজ লম্বা ও ১ হাত চওড়া হত। এই কাপড় মাকড়শার জালের মত সূক্ষ্ম ছিল। এটি পরে থাকলেও দেহ প্রায় নগ্নই থাকত। ট্যাভার্নিয়ে বলেছেন এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করতে দেয়া হত না। মোগল আমলের বিত্তশালীদের পত্নীরা, হারেমের রক্ষিতারা, নর্তকী ও গায়িকারাও এই কাপড় পরত। বাদশাহের মহিষীরাও গরমের দিনে এই মসলিন পরতেন।
৩। সরকার-ই-আলা(সরকার আলি)- নবাবদের জন্যই তৈরি হত। দিল্লির বাদশাহদের নজরানা দেয়া হত।
৪। রঙ্গ- মাকড়শার জালের মত জালিকাকার মসলিন।
৫। আব-ই-রওয়ান(আবরোয়ান)- আব>জল, রওয়ান>প্রবাহিত। কাকচক্ষু জলের মতই স্বচ্ছ ছিল। এই মসলিন নিয়ে দুটি লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে। সম্রাট আওরঙ্গজেব একবার তার কন্যা জেব উন্নিসাকে সভায় নগ্ন হয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য তিরস্কার করেন। তখন নাকি জেব উন্নিসা বলেন তিনি সাতটি(মতান্তরে সাত প্যাঁচ) আবরোওয়ান পরে আছেন।
আলীবর্দী খাঁর সময় এক শিল্পী তার তৈরি করা আবরোয়ান কে নাকি জমিতে শুকোতে দিলে একটি গরু এসে ঘাসের সাথে তাকে খেয়ে ফেলে। এতই ছিল তার সূক্ষ্মতা। নবাব সেই চাষীকে তার ফলশ্রুতিতে ঢাকা থেকে তাড়িয়ে দেন।
৬। খাস্‌সা- পারসি শব্দ ‘খাসা’ থেকে। আঠার ও উনিশ শতকে তা ‘জঙ্গল খাস্‌সা’ নামেও পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের জঙ্গল বাড়ির তাঁতিরা এই মসলিন তৈরি করত।
৭। শবনম- ভোরের শিশিরের মত কোমল ও স্বচ্ছ ছিল। সকালে শুকোতে দিলে ভোরের শিশিরের মতই ঝলমল করত।
৮। আলিবালি(আলবাল্লে)- পেরিপ্লাস এই মসলিনকে ‘Abollai’ বলে উল্লেখ করেছেন।
৯। তনজেব- তন>দেহ, জেব>অলঙ্কার। এই মসলিন মহিলারা গায়ের অলঙ্কারের মতই পরিধান করতেন।
১০। তরান্দাম(তুরন্দাম)- তুর’র>রকম; আরবী, উদাম>নগ্নতা;পারসিক। এই মসলিন পরলে মনে হত সেই নারীর পরনে কিছু নেই।
১১। নয়নসুখ- গলাবন্ধ রুমাল তৈরি হত।
১২। বদনখাস।
১৩। সর-বন্দ- সর>শির;মাথা, বন্দ>বাঁধা। মাথার পাগড়ি তৈরি হত।
১৪। সর-বুটি(সরবতী)- মানে মোচড়ানো। এ দিয়েও মাথার পাগড়ি তৈরি হত।
১৫। কামিছ(কুমিস)- আরবী, কামিজ বা শার্ট। এ দিয়ে পুরুষদের জামা বা কুর্তা তৈরি হত।
১৬। ডোরিয়া- ডোরাকাটা বা দাঁড়-বিশিষ্ট মসলিন।
১৭। চারকোণা(চারখানা)।
১৮। জামদানী- মসলিনের জগতে রানীর মত বিরাজ করত। এখনকার দিনেও ঢাকাই জামদানীর চাহিদা সারা পৃথিবীব্যাপী। তবে জামদানী মসলিনের সাথে আজকের শ্রেষ্ঠ জামদানীরও কোনো তুলনাই হয় না।
তার ‘ঢাকাই মসলিন’ নামক বিখ্যাত বইয়ে ড. আবদুল করিম বলেছেন মসলিনের নামগুলো দেখেই বোঝা যায় এগুলো সব পারসিক বা আরবী শব্দ থেকেই এসেছে। তাই তিনি মনে করেন প্রাচীন যুগ থেকে চালু হলেও মধ্যযুগে সুলতানি ও মোগল যুগেই এই মসলিনের ঐতিহ্য সারা পৃথিবীতে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তথ্যসূত্রঃ ঢাকাই মসলিনঃ ড. আবদুল করিম।
ঢাকার মসলিনঃ মুনতাসির মামুন।
বাণিজ্যে বাঙ্গালী- সেকাল ও একালঃ সুভাষ সমাজদার।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *