বাংলা থেকে জৈনরা সব গেলেন কোথায়?

জৈন ধর্মমত সম্ভবত ভারতের প্রাচীনতম। অনেকে বলেন আর্যরা আসার অনেক আগে থেকেই এ দেশে জৈনমত প্রবর্তিত ছিল। ‘জিন’ শব্দ থেকে জৈন কথার উৎপত্তি। ‘জিন’ মানে যিনি জয়লাভ করেছেন। কামনা-বাসনা, রাগ-দ্বেষ, হিংসা-লোভ যিনি জয় করেছেন তিনিই জিন। জৈনরা অনেক জায়গায় ‘নির্গ্রন্থ’ নামেও পরিচিত, অর্থ গ্রন্থিহীন বা বন্ধনমুক্ত। জৈনরা সন্ন্যাসী। তারা সকল প্রকার সামাজিক বন্ধন থেকে মুক্ত।

জৈনদের ধর্মগ্রন্থের নাম ‘আগম’ বা ‘সিদ্ধান্ত’- জৈনাগম বা জৈনসিদ্ধান্ত। তবে তাদের আদি শাস্ত্র চতুর্দশ ‘পূর্ব’ বা প্রাচীন তত্ত্ব। তীর্থঙ্কর মহাবীর তাঁর শিষ্যদের এ থেকেই শিক্ষা দেন। যদিও ভদ্রবাহু বিরচিত ‘কল্পসূত্র’ হচ্ছে জৈনদের মধ্যে সবচেয়ে লোকপ্রিয় গ্রন্থ। এই ভদ্রবাহু আমাদের বাংলার লোক। সে কথায় আমরা পরে ফিরে আসব। বেদের মত জৈনদের সাহিত্যও দীর্ঘদিন লিখিত হয় নি। গুরু পরম্পরায় শিষ্যদের মধ্যে কথিত হত। বৌদ্ধসাহিত্য লিখিত হবার অনেক পরে জৈনসাহিত্য লিখিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

তবে এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে জৈনধর্মই আমাদের বাংলার আদিমতম আর্যধর্ম। বৌদ্ধরা আসার বহু আগে থেকেই এই ধর্ম বাংলায় প্রচলিত ছিল। জৈনদের প্রধান ধর্মগুরু ছিলেন মহাবীর। তিনি বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন। তিনি ছিলেন ২৪ তম তীর্থঙ্কর। তাঁর আগে ২৩ জন তীর্থঙ্কর জীবিত ছিলেন। সুতরাং অনুমান করা যায় এই জৈনধর্ম কত প্রাচীন। আমাদের বাংলার প্রায় সর্বত্র জৈন মূর্তি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর ও বর্ধমানে অর্থাৎ রাঢ়ভূমিতে। সুন্দরবনেও দশ-বারোটির মত জৈনমূর্তি পাওয়া গেছে। তবে মনে হয় পৌন্ড্রবর্ধন বা উত্তরবঙ্গই ছিল বাংলায় জৈনধর্ম বিস্তারের আদি অঞ্চল। পুন্ড্র বা পৌন্ড্র শব্দের অর্থ ইক্ষু বা গুড়। এই অঞ্চলে আগে খুব আখের ও তা থেকে গুড়ের উৎপাদন হত বলে এর নাম ছিল পৌণ্ড্রবর্ধন।

জৈন ‘আচারাঙ্গসূত্র’ গ্রন্থে আছে মহাবীর (নির্বাণকাল ৪৬৭ খ্রীঃপূঃ) কিছুকাল লাঢ় বা রাঢ়দেশে ধর্মপ্রচারের জন্য এসেছিলেন। তিনি লাঢ় ছাড়াও বজজভূমি ও সুভবভূমিতে (দক্ষিণরাঢ়) কিছুদিন ছিলেন। কথিত আছে সেই সময় ছিল বর্ষাকাল। বাংলায় কোনো রাস্তাঘাট কিছু ছিল না। মশা ও মাছির অত্যাচারে তিনি খুব কষ্ট পান। ভিক্ষে করতে পথে বের হলে বাংলার আদিবাসিরা তাঁকে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। তারা ‘ছু ছু’(খুক্‌খু) করে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর মহাগ্রন্থ ‘বাঙালির ইতিহাস’এ খুব সুন্দরভাবে এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন এই যে আমরা আজও কুকুরকে ‘তু তু’ বা ‘চুক চুক’ বলে ডাকি এগুলো আদি অস্ট্রিক শব্দ ছক্‌, ছো, অছো, বা ছু – এসব থেকে এসেছে যার অর্থ হল কুকুর। তাই ‘চু চু’ বা ‘তু তু’ কোনো ধ্বন্যাত্মক শব্দ নয় এগুলো বাংলার আদি দেশজ অস্ট্রিক শব্দ। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে মহাবীরের সময়কালে বাংলায় অস্ট্রিক ভাষারই প্রচলন ছিল।

এ কথা অবশ্যই উল্লেখ্য যে বাংলায় যেসব জৈনমূর্তি পাওয়া গেছে তা ঋষভনাথ, আদিনাথ, নেমিনাথ, শান্তিনাথ ও পার্শ্বনাথের। এদের মধ্যে পার্শ্বনাথের মূর্তির সংখ্যাই বেশি। এরা সকলেই কিন্তু মহাবীরের আগেকার তীর্থঙ্কর। পার্শ্বনাথ ছিলেন মহাবীরেরও গুরু। বার্ষ্ণেয় কৃষ্ণের কাকার ছেলে ছিলেন অরিষ্টনেমি বা নেমিনাথ। এই ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে ২০ জনই যাদের মধ্যে পার্শ্বনাথও আছেন পরেশনাথ পাহাড়ে জৈন প্রথা অনুযায়ী অনশন করে মৃত্যুবরণ বা নির্বাণলাভ করেন। পার্শ্বনাথের থেকেই এই পাহাড়ের এমন নাম হয়েছে। বর্তমান ঝাড়খন্ডে অবস্থিত এই পার্শ্বনাথ পাহাড় জৈনমতে ‘সমেতগিরি’ নামে পরিচিত। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এটি জৈনদের কত প্রাচীন তীর্থ। সেই সময় কিন্তু পার্শ্বনাথ পাহাড় বৃহত্তর বাংলারই অঙ্গীভূত ছিল।

মহাবীরের মৃত্যুর পর তার কয়েকজন প্রধান শিষ্যের মাধ্যমে এই ধর্মপরম্পরা চলতে থাকে। এদের মধ্যে প্রধানতম ভদ্রবাহু ছিলেন আমাদের বাংলার মানুষ। তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্যের গুরু ছিলেন। একবার উত্তরভারতে প্রবল দুর্ভিক্ষ হওয়ায় যখন শ্রমণদের ভিক্ষে করা মুশকিল হয়ে যায় তখন তিনি কয়েকজন শিষ্য নিয়ে দক্ষিণ ভারতে যাত্রা করেন। উত্তরের ভার দিয়ে যান স্থূলভদ্রের হাতে। ভদ্রবাহু চতূর্দশপূর্ব জানতেন। তার অনুপস্থিতিতে স্থূলভদ্র পাটলীপুত্রে ১১ টি অঙ্গের সঙ্কলন করেন। ১২তম অঙ্গ নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে তাকে কিছুটা জোড়াতালি দিয়ে সংকলিত করা হয়। এদিকে দুর্ভিক্ষের কালে দক্ষিণে ভদ্রবাহুর শিষ্যরা তিতিক্ষার চরম হিসেবে তাদের বস্ত্রও ত্যাগ করেন- তাই তারা দিগম্বর নামে পরিচিত হন। স্থূলভদ্রের শিষ্যরা উত্তরে সাদা বস্ত্র পরতে শুরু করেন- তারা তাই শ্বেতাম্বর নামে পরিচিত হলেন। এদিকে প্রব্রজ্যাকালে ভদ্রবাহু দক্ষিণের শ্রবণবেলগোলায় নির্বাণ প্রাপ্ত হন। আমরা দেখি পরে বিক্রমাদিত্যও গুরুকে অনুসরণ করে এখানে দেহত্যাগ করেন। ভদ্রবাহু মারা গেলে তাঁর শিষ্যরা উত্তরে ফিরে আসেন। ১২তম অঙ্গ তারা কিছুতেই মানতে চান না। এই নিয়ে জৈনরা তখন শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যান। আজও তাদের মধ্যে হানাহানি মতবিরোধের শেষ নেই। এখানে উল্লেখ্য যে বাংলায় যেসব জৈনমূর্তি পাওয়া গেছে সেগুলো সবই দিগম্বর জৈনমূর্তি।

হিউ এন সাং যখন খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে ভারতে আসেন তখন তিনি বৈশালী, পৌণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কলিঙ্গে প্রচুর নির্গ্রন্থ জৈনদের দেখতে পান। যদিও সে সময় বাংলায় আজীবিকদের প্রাধান্য ছিল খুব বেশি। তাই তিনি আজীবিকদের সাথে জৈনদের গুলিয়েও ফেলতে পারেন কারণ আজীবিক ও জৈনদের আচারে পার্থক্য খুবই কম। বাংলায় যেসব জৈনমূর্তি পাওয়া গেছে তাতে পালযুগের শিল্পকলাই পরিলক্ষিত হয়। তবে যেহেতু পালরাজারা ছিলেন বৌদ্ধ তাই তাদের সময় থেকেই বাংলায় জৈনধর্মের প্রসার কমে আসে। খ্রিষ্টীয় ১০০০ শতকের পর থেকে বাংলায় জৈনধর্মের আর সেরকম কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।

সম্রাট অশোকের সময় অর্থাৎ ৩০০ খ্রীঃপূঃ থেকে শুরু করে খ্রিষ্টীয় ১০০০ শতক পর্যন্ত বাংলায় জৈনধর্মের ঐতিহাসিক কাল বলে মনে হয়। ‘দিব্যাবদান’ গ্রন্থে আছে অশোক যখন ‘চন্ডাশোক’ ছিলেন বাংলায় জৈনরা বুদ্ধের মূর্তিকে অবমাননা করায় তিনি পাটলিপুত্রে( নাকি বাংলায়?) ১৮,০০০ জৈনকে হত্যা করেন। সেসময় যে বাংলায় অন্তত ১৮,০০০ জৈন মতাবলম্বী ছিলেন এটা মুখের কথা নয়।

বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে জৈন প্রভাব এখনও কিন্তু কিছু কিছু বজায় আছে। ক্ষিতিমোহন সেন তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন আমাদের বাংলায় সন্তানের জন্মের ষষ্ঠদিনে যে ষষ্ঠীপুজো করে সন্তানের সৌভাগ্য কামনা করার চল আছে এটা জৈন বিশ্বাসের থেকেই এসেছে। বাংলায় আজও প্রচলিত শূর, চন্দ্র, গুপ্ত, মিত্র, দত্ত, দেব, বসু, সেন, নন্দী, ধর, ভদ্র এই পদবীগুলো কোনো সুদূর অতীতে জৈনধর্মের সংযোগ সূচিত করে। তিনি আর বলেছেন বাঙালিদের মধ্যে যে নাম ও পদবীর মাঝে চন্দ্র বা নাথ লেখার চল তাও সম্ভবত জৈনধারার প্রভাব। বাংলার লোকেদের নামের যে একটি অর্থ থাকে সেটিও জৈনপ্রভাব থেকেই এসেছে। জৈনরা নাগ আরাধনায় বিশ্বাসী। অনেকে বলেন ভারত তথা বাংলায় নাগপূজার চলও একটি জৈন প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। সুনীতিবাবু বলেছেন আজও পুরুলিয়ার মানভূমের ‘সরাকি’ বা ‘শ্রাবক’ নামে পরিচিত হাতে গোনা কিছু লোক প্রত্যক্ষভাবে জৈন আচার অনুসরণ করেন।

তবে প্রায় ১৩০০ বছর বাংলায় প্রচলিত থেকেও এই ধর্ম বাংলা থেকে প্রায় সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেল কিভাবে? একটা কথা মনে রাখতে হবে বাংলায় জৈনধর্ম কিন্তু কখনও রাজানুগ্রহ লাভ করে নি। তখনকার দিকে রাজার ধর্ম প্রজারা গ্রহণ করতেন। তাই জৈনদের সংখ্যা বাংলায় কখনই খুব বেশি ছিল না। আর আমাদের বাংলা চিরকালই মাতৃ ও শাক্ত মতবাদে বিশ্বাসী। আমাদের বাংলার ঘরে ঘরে হয় শাক্ত নয় বৈষ্ণব। তাই অহিংসা ও নিরামিষ আহারে বাধ্যবাধকতা বাঙ্গালিরা মন থেকে গ্রহণ করতে পারে নি। পরে বৌদ্ধ ও সহজিয়া ব্রাহ্মণ্যধর্মের বন্যায় এটি খড়কুটোর মত ভেসে যায়। আরেকটা কথাও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে জৈনধর্ম কিন্তু বাংলায় নিয়ে আসে বণিকরা। পাটলিপুত্র থেকে নৌযোগে তাম্রলিপ্তি সেখান থেকে নদী পথেই অজয় দামোদর মহানন্দা হয়ে বাংলায় এটি ছড়িয়ে পড়ে। জৈনমন্দিরগুলোও সব গড়ে উঠেছিল নদীর ধারে ধারেই। আজও আমরা দেখি গুজরাট, রাজস্থান কি কর্ণাটকের ব্যবসায়ী শ্রেণীদের মধ্যেই এই ধর্ম এখনও টিকে আছে। তাম্রলিপ্তি নদীর গতিপথ পরিবর্তনে অচল হয়ে পড়ায় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এই ধর্ম বণিকদের সাহায্য হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে শৈববাদ ও শাক্তবাদের প্রবল জোয়ারে বাংলায় এর অস্তিত্বরক্ষাই কঠিন হয়ে পড়ে। আজও আমাদের বাংলায় যে কয়টি জৈন সম্প্রদায় দেখি তারা বেশিরভাগই পশ্চিমী, ব্যবসার সূত্রে বাংলায় আছেন। জৈনরা প্রায় হাজার বছর আগে বাংলা থেকে হারিয়ে গেছেন কিন্তু তাদের কিছু কিছু ঐতিহ্য এখনও বাংলার পথঘাট ও সমাজে চালু আছে। যদি নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করা যায় তবে এই ইতিহাস হয়ত আরও প্রকাশিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *