বিড়ালভগবান ।

আজ আমাদের সারা পৃথিবীতে গরীব হোক বা বড়লোক যারা বিড়াল ভালোবাসে তারা অনেকে বিড়াল পোষে। যারা ঘরে না পোষে অন্তত দুবেলা এঁটোকুটো এদের খেতে দেয়। বিড়াল না পুষলেও মায়ের পেটে বাচ্চা এলে কখন যে সে সিঁড়ির ঘরে রাখা পুরনো বাক্সে বাচ্চা প্রসব করে দুধ খাওয়াতে শুরু করে তা কয়েকদিন না গেলে অনেকেরই বোঝার উপায় থাকে না। আজ সারা দুনিয়ায় এই বিড়ালপ্রেম সহজে দেখা গেলেও এর ইতিহাস কিন্তু লুকিয়ে আছে পাঁচ হাজার বছর আগের প্যাপিরাসে ও পিরামিডের ভেতরের হায়ারোগ্লিফিক এবং মমিতে। প্রাচীন মিশরীয়রাই প্রথম বিড়ালকে যে কেবল গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে শুধু ভালোবেসেছিল তাই নয় তারা তাদের অন্যান্য অর্ধেক প্রাণী অর্ধেক দেবতার মত বিড়ালকে তাদের দেবতা হিসেবেও মর্যাদা দিয়েছিল।

  মিশরীয়রা প্রথম বিড়ালকে তাদের সমাজে এত উঁচু জায়গায় বসালেও মনে হয় আফ্রিকার অন্য কোনো দেশ থেকেই তারা প্রথমে বিড়ালকে তাদের দেশে নিয়ে আসে। মিশর নীলনদের দান। বর্ষাকালে বৃষ্টি ও বন্যা হয়ে চাষের জমি প্লাবিত হলে যে নবীন পলিমাটির প্রলেপ পড়ে যেত তাতে প্রচুর শস্য উৎপাদন হত। রোমান সাম্রাজ্য অত বছর পরেও তার খাদ্যের জন্য আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকত। এই চাষের জমিতে যার উৎপাত চাষীদের অতিষ্ঠ করে দিত তা ছিল ইঁদুর। মিশরীয়রা দেখেছিল এই ইঁদুর ধরার ক্ষেত্রে বিড়ালের দক্ষতা ও ক্ষিপ্রতা। তাই মিশরে চাষীরা প্রথম একে পোষ মানাতে শুরু করলেও আস্তে আস্তে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অভিজাতদের মধ্যেও পোষ্য হিসেবে বিড়াল প্রথম সারিতে চলে আসে। শুধু ইঁদুর নয়, মিশরীয়রা আরেক প্রাণীকে প্রচন্ড ভয় পেত সেটি সাপ। বিষধর সাপকে শিকার করার ক্ষেত্রেও বিড়াল তাদের খুব উপযোগী হয়ে ওঠে।

বাস্তেত।

  ক্রমে মিশরীয়রা বিড়ালকে তাদের দেবতাও বানিয়ে ফেলে। এই বিড়ালদেবতার নাম ছিল বাস্তেত। এই বাস্তেত আদপে অন্য এক দেবতার বিবর্তনের ফলে এসেছিল- শেখমেট। শেখমেট ছিল ভয়ংকর হিংস্র দেবতা। এর মাথা সিংহের আর দেহ নারীর। এর কাজ ছিল পাপীকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে শাস্তি দেওয়া। ক্রমে এই দেবতাই মিশরীয়দের কাছে নমনীয় হয়ে বাস্তেত দেবীতে পরিণত হয়। এই দেবীর মাথা বিড়ালের ও নিচের অংশ নারীর। কেউ কেউ বলেন বাস্তেত আর শেখমেট দুই বোন। তাদের বাবা সূর্যদেবতা আমন রা। কেউ আবার বলেন আমন রা দিনের বেলা পরিভ্রমণ করে রাতের বেলা বাস্তেতে রূপান্তরিত হন। তাঁরই নৈশরূপ বাস্তেত।

বিড়ালের মমি।

  মিশরীয়রা বাড়িতে তাদের দেবতার সাথে পোষা বিড়ালকেও পুজো করত। বিড়ালকে হত্যা করার শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। কথিত আছে এক রোমান সেনা একটি বিড়ালকে হত্যা করলে অগণিত মিশরীয় লোক তাকে তাড়া করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অভিজাত ও রাজপরিবারের লোকেরা তাদের মমির সাথে বিড়ালেরও মমি তৈরি করত। পরিবারের পোষা বিড়াল মারা গেলে তাকে মমি করে কবর দিত। অনশন পালন করে শোকপালন করা হত। সঙ্গে দিত তার প্রিয় খাবার ও আসবাব। মিশরে প্রায় হাজার দুয়েক বিড়ালের মমি পাওয়া গেছে। এমন অনেক মমিই বিদেশের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

শেখমেট।

  বিড়ালকে দেবতা বা দেবতার কাছাকাছি কোনো মাধ্যমে পরিণত করার উদাহরণ খুব একটা বেশি নেই। মিশরের পরেই যে দেশের নাম করা যায় তা আমাদের বাংলা। এখানে আমাদের পূজিত ষষ্ঠীদেবীর বাহন হল বিড়াল। কিন্তু এই ষষ্ঠীদেবী আসলে কে? তা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। এই দেবী যে আদিতে অনার্যদের দেবতা ছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্কন্দ-কার্তিকের স্ত্রী এই ষষ্ঠীদেবী। এই কার্তিকও ছিল অবৈদিক দ্রাবিড় দেবতা। ক্রমে তার আর্যায়ন ঘটে। তিনি তারকাসুরকে বধ করে বৈদিক দেবতার মর্যাদা পান ও উমার পুত্র বলে পরিচিত হন। রাঢ়বঙ্গে পূজিত আরেক বিখ্যাত দেবতা ধর্মঠাকুর। ইনি এমন এক দেবতা যার উৎপত্তি নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে অনেক মতবিরোধ আছে। আমরা পন্ডিত নই। তাই সাধারণভাবে বলতে পারি নিম্নশ্রেণীর শবর বা ডোম জাতির পূজিত দেবতা ছিলেন এই ধর্মঠাকুর। ডোম>ডম্বরু>ধম্মো>ধর্ম এইরকম কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে ধর্মঠাকুরের নাম এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। এই ধর্মঠাকুরের পত্নী হিসেবেও অনেকে ষষ্ঠীদেবীকে উল্লেখ করে থাকেন।

ষষ্ঠীদেবী।

  দেবী ষষ্ঠী মূলত প্রজননের দেবী হলেও আমরা ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখব যে অন্যান্য হিন্দু দেবীদের মত এনারও মূল নিহিত আছে শস্যদেবী হিসেবে পূজিত হওয়ার ঐতিহ্যে। কার্তিক পুজো অনেক গ্রামে মূর্তি ছাড়াই হয়। মাটির মালসায় নকল শস্যক্ষেত্র তৈরি করে তাতে বীজ ছড়িয়ে কার্তিকের পুজো হয়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ‘Garden of Adonis’ নামে যে শস্যদেবীর পুজো হত কার্তিক, ইতু, ষষ্ঠীপুজোতেও আমরা সেই ধারা লক্ষ্য করে থাকি।

  কার্তিক পুজোর আগের দিন অনেকের বাড়িতে কার্তিক ফেলে যাবার রেওয়াজ আছে। বিশেষ করে যাদের পরিবারে অনেকদিন বাচ্চা আসছে না। অনেক জায়গায় বলা আছে কার্তিক অবিবাহিত। চিরকুমার। চিরকুমারের সাথে প্রজননের ব্যাপারটা ঠিক খাটে না। তবে অন্যভাবে দেখলে বুঝি যেহেতু তার পত্নী ষষ্ঠী প্রজননের দেবী তাই তার পুজোতেও সন্তানলাভের সম্ভাবনা থেকে যায়।

  বেশ্যাপাড়ায় কার্তিকপূজোর চল আছে। তারা একে বলে ‘নবকার্তিক’। আপনি জিজ্ঞাসা করলে দেখবেন তারা বলছে যে তারা নবকার্তিকের মত সুদর্শন ও রুচিশীল খদ্দের প্রার্থনা করেন। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তা নয়। আজ বেশ্যাবৃত্তি অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নিম্নস্তরীয় জীবিকা হলেও আগে তা ছিল না। বুদ্ধ ও কৌটিল্যের সময় নাগরিকাদের বিশেষ সম্মান ছিল। আগে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বেশ্যাদের ষোলোকলায় পারদর্শিনী হতে হত। কয়েক বছর আগেও গৃহস্থ বাড়িতে সরস্বতী পুজো হত বই দিয়ে। কেবল বেশ্যাপাড়াতেই মূর্তি দিয়ে সরস্বতীর পুজো হত। আজও অনেক প্রাচীন ঐতিহ্যের দুর্গাপুজোয় বেশ্যাবাড়ির মাটি লাগে।

  তাই কার্তিকের সাথে সম্পর্কিত দেবী ষষ্ঠীও ক্রমে শস্যদেবী থেকে প্রজননের দেবীতে পরিণত হয়ে গেছেন। কিন্তু তার বাহন বিড়াল কেন? এটা আমাদের খুব অবাক করে। বিড়াল প্রাচীন সাহিত্যে খুব উল্লিখিত প্রাণী নয়। দেবতার বাহন হিসেবেও খুব বেমানান। এর থেকেই আমাদের ভারতীয়দের সঙ্গে প্রাচীন মিশরের এক ঐতিহ্যগত যোগসূত্রের কথা আমরা নতুন করে ভেবে দেখতে পারি। পন্ডিতেরা যদিও সে সম্ভাবনা বহু আগেই উড়িয়ে দিয়েছেন, আমরা তাকে ভেবে দেখতেই পারি। রাঢ়ের যে ধর্মঠাকুর তাকে অনেকে মিশরের সূর্যদেবতা আমন রার সাথে তুলনা করেছেন। ধর্মঠাকুরের পুজাপদ্ধতির সাথে মিশরীয় মিথলজির অনেক মিল। আমাদের সব দেবীর পুজোই চান্দ্রমাস ধরে হয়। ষষ্ঠীপুজো হয় কিন্তু সৌরমাস হিসেবে। রাঢ় অঞ্চলের পুজোয় এখনও যে আলপনা ব্যবহার করা হয় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন তার সাথে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিকের খুব মিল আছে।

  মনে হয় ষষ্ঠী আগে বাংলার অনার্য অস্ট্রিক ডোম শবরদের দ্বারা পূজিত হতেন। তাকে রাঢ় বাংলায় ধর্মঠাকুরের পত্নী বলে উল্লেখ করা হলেও পরে আর্যায়নের কালে তাকে স্কন্দ-কার্তিকের পত্নী হিসেবে উল্লেখ করা শুরু হয়। তা মিশরের বাস্তেত হোন বা আমাদের ষষ্ঠীদেবী এদের সাথে যে এক আশ্চর্য রহস্যময় প্রাণী জড়িয়ে আছে সেটি বিড়াল। প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় বিড়ালকে বলা হত ‘মিউ’ বা ‘মি’। মিশরীয়রা একে সমৃদ্ধির দেবী বলে মনে করলেও আমাদের দেবীর বাহন হিসেবে একে প্রজননের সাথেই যুক্ত করা হয়েছে। রহস্যময় এই প্রাণীটির সাথে নানান ভয়ভীতির কল্পকথা মেশানো হলেও প্রাচীন মিশরের মতই আজও আমাদের বাংলাই হোক ভারতই হোক বা আমেরিকা জাপান যে কোনো দেশই হোক না কেন বাস্তেত ও মা ষষ্ঠীর কৃপায় আজ বিড়ালদের সাম্রাজ্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *