ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান।

আমার মত যারা অর্বাচীন পৃথিবী থেকে প্রাচীন পৃথিবীর দিকেই ফিরে যেতে বেশি পছন্দ করেন তারা সকলেই ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানের কথা শুনেছেন বা জানেন। প্রাচীন পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্য কীর্তির একটি এটি। তবে বাকি ক’টির সাথে এর একটি বিশেষ পার্থক্য হল এটি নির্মিত হয়েছিল এক প্রেমিক রাজার তার রানিকে খুশি করার জন্য। তাই তাজমহলের মত এতেও একটি প্রেমের রঙ লেগে আছে।

বিখ্যাত আসিরীয় সভ্যতাকে ধ্বংস করে ক্যাল্ডিওন ও মেদীওরা নিও ব্যাবিলনিয়ান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করলেন। অসুরদের রাজধানী নিনেভে ও পৃথিবীর প্রথম লাইব্রেরিকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে তারা আবার ব্যাবিলনে তাঁদের রাজধানী নতুন করে প্রতিষ্ঠা করলেন। এই ব্যাবিলন ছিল আজকের দিনের ইরাকে। আক্কাডিয়ানরা বলত সুমের, গ্রিকরা বলত মেসোপটেমিয়া। আমরা আজকের ইরাকে নিরন্তর যুদ্ধবিগ্রহ দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু যারা ব্যাবিলনের প্রাচীন ইতিহাসের কিছুটা খোঁজ রাখেন তারা জানেন ব্যাবিলনের ইতিহাসে এই পরম্পরা তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে এসেছে। রাজা হয়ে নতুন করে ব্যাবিলনকে তৈরি করলেন সম্রাট দ্বিতীয় নেবুখুদনিজুর। প্রেমের দেবী ইসতারের সম্মানে রঙ্গিন ‘ইস্তার গেট’ তৈরি করলেন। শহরের মাঝখানে ৩০০ ফুট উঁচু জিগগুরাট নির্মাণ করলেন। কিন্তু তাঁর সকল কীর্তিকে ছাপিয়ে গেল ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান। এর পরে আড়াই হাজার বছর ধরে সেই বাগানের মিথ লোকের মুখে মুখে ঘরে বেড়াবে। সারা দুনিয়ার সম্রাট অ্যালেকজান্ডার ব্যাবিলনে যখন মৃত্যুশয্যায় তখন জ্বরের জ্বালা কমাতে নাকি জীবনের শেষ কয়েক দিন কাটিয়েছিলেন এই বাগানের গাছের ছায়ায়। ঝুলন্ত বাগানের জলীয় কুয়াশার মতই ধোঁয়াটে সেই অতীত। আমরা জানি আবার জানিও না। অবিশ্বাস করি আবার বিশ্বাস না করেও পারি না।

ব্যাবিলনের প্রেমের দেবী ইসতার।

রাজাদের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য অন্য দেশের রাজকন্যাকে বিয়ে করা বহুদিন ধরেই চালু আছে। নেবুখুদনিজুর মেদীয়দের সাথে রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলতে তাঁদের দেশের কন্যা আমিতুসকে বিয়ে করেন। আমরা যে সময়ের কথা বলছি তা মোটামুটি খ্রীঃপূঃ ৬০৫ থেকে খ্রীঃপূঃ ৫৬২ সালের মধ্যেকার সময়। এই সময় ধরে নেবুখুদনিজুর ব্যাবিলনে রাজত্ব করেন। রানিকে তো বিয়ে করে এনেছেন কিন্তু সুন্দরী রানির মনে সুখ নেই। ব্যাবিলন যে এখনকার ইরাক তা তো আগেই বলেছি। আর মেদীয়রা বাস করতেন পাহাড় ঘেরা এখনকার ইরানে। মরুভূমির মাঝখানে বসে রানির মন খালি তার মাতৃভূমির পাহাড়, কুয়াশা, সিডার গাছ, আঙ্গুর বাগানের দিকে ফিরে ফিরে যায়। কিছুতেই ব্যাবিলনের অসহ্য গরম ও রুক্ষতায় তার মন ভরে না। সম্রাট তার সব ঐশ্বর্য দিয়েও রানিকে খুশি করতে পারেন না। এতদূর অবধিও ঠিক ছিল কিন্তু যেদিন রানি তার দেশে বাপের বাড়ি ফিরে যাবার কথা বললেন সেদিন রাজা প্রমাদ গুনলেন।

রানি আমিতুস।

রাজা জানেন মেদীয়রা একে কিছুতেই ভালোভাবে মেনে নেবে না। তিনি সবে জেরুসালেম পুড়িয়ে ছারখার করে হিব্রুদের পায়ে পিষে এসেছেন। তারও আর যুদ্ধবিগ্রহ ভালো লাগছে না। তাছাড়া সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভিন্ন স্বাধীনতাপ্রিয় গোষ্ঠীর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা তো আছেই। রাজা তাই দেরি না করে ডেকে পাঠালেন তার প্রধান স্থপতি মিরোডাককে। হুকুম হল একমাসের মধ্যেই বানিয়ে দিতে হবে এক বাগান যা হবে ইসতারের নন্দনকানন, না হলে প্রাণদন্ড। মিরোডাক রাজার মেজাজ বোঝেন, তিনি বললেন সে না হয় হবে কিন্তু এর নির্মাণে খরচ হবে প্রচুর অর্থ, আর একে চালাতে চাই প্রচুর ক্রীতদাস যাদের দিন-রাতে পালা করে কাজ করতে হবে। রাজা বললেন সেসব বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। তিনি সদ্য জেরুসালেম জয় করে এসেছেন। সঙ্গে এনেছেন প্রচুর সোনা আর অজস্র হিব্রু ক্রীতদাস কিন্তু কাজ হওয়া চাই দ্রুত। কথিত আছে ৫৮০ খ্রীঃপূঃ মাত্র ১৫ দিনে রাজার স্থপতি এই আশ্চর্য বাগান তৈরি করেন। কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে তা জানার উপায় আমাদের হাতে নেই।

সম্রাট দ্বিতীয় নেবুখুদনিজুর।

ব্যাবিলনের ঐতিহাসিক বেরোসাসের বিবরণেই আমরা প্রথম এই বাগানের কথা জানি। তারপর গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস ও ভৌগোলিক স্টারবো এই বাগানের কথা বলে গেছেন। তবে তাঁদের সময় ব্যাবিলনে এই বাগান অক্ষত ছিল কিনা আমাদের জানা নেই। এই বাগান ছিল ১২০ বর্গ মিটার জায়গা নিয়ে, এর উচ্চতা ছিল প্রায় ২৫ ফুট। বাগানের নিচে ছিল ১৪ টি বড় বড় ঘর বা ‘সেলার’ ছিল। হেরোডোটাস বলেছেন এটি প্রায় ব্যাবিলনের বিখ্যাত প্রাচীরের মতই উঁচু ছিল। চারটি ধাপে এটি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতি তলার সামনে ছিল বিরাট লম্বা আর্চ। আর্চগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে দূর থেকে দেখলে মনে হত বাগানটি আকাশে ভাসছে। চারটি তলা সিঁড়ির মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। প্রতিটি তলায় ছিল অনেক ফাঁকা স্তম্ভ। তাঁদের মধ্যে মাটি ভরে বড় বড় গাছ লাগানো হয়েছিল। রানির দেশ মিডিয়া থেকে আনা হয়েছিল সিডার, ওক, এবোনি, জলপাই, আঙ্গুর, আপেল, খেজুর, সাইপ্রাস ও ডালিম গাছ। এছাড়াও তার দেশের বাড়ি থেকে প্রচুর ফুলগাছ ও মাটি নিয়ে এসে তাতে সেই ফুলগাছগুলো লাগানো হয়েছিল। সুন্দর ফুলের সুবাস আর বড় বড় গাছের ছায়ায় সত্যিই ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান ছিল মরুভূমির মধ্যে স্বর্গীয় মরূদ্যান।

স্থপতি প্রধান সমস্যায় পড়লেন জল নিয়ে। ব্যাবিলন মরুভূমির দেশ। মরুভূমিতে বৃষ্টি প্রায় হয়ই না। তারমধ্যে একটাই নদী ইউফ্রেতিস, যা কিনা ব্যাবিলন শহর থেকে অনেকটাই দূরে। পরিখা কেটে নদীর জলকে বাগানের কাছে নিয়ে আসা হল। তারপর কয়েকটা চেন পাম্পের সাহায্যে সেই জলকে চারতলায় তোলা হল। এই চেন পাম্পের টেকনোলজি অনেক পরে বিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু আমাদের অনুমান যদি সত্যি হয় তাহলে রাজার স্থপতি মিরোডাকই প্রথম সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। সেই চেন টানার জন্য প্রচুর সংখ্যায় ক্রীতদাসেরা ২৪ ঘন্টা পালা করে সারা বছর ধরে ডিউটি দিয়ে যেতেন। সেই ক্রীতদাসেদের মধ্যে হিব্রুরাই ছিল প্রধান যারা বহুবছর ব্যাবিলনে দাসত্ব করেছিল। পরে এরাই ইহুদি নামে পরিচিত হবেন।

জল চারতলায় উঠলে তাকে ছোট ছোট নালার মাধ্যমে সব গাছের গোড়ায় পাঠানো হত। জলকে ওপর থেকে নিচে ঝরনার মত গড়িয়ে ফেলা হত যাতে তা দেখে রানির তার দেশের পাহাড়ি ঝোরার কথা মনে হয়। জল নিচে পড়ার সময় যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হত তাতে সারা বাগানে এক অদ্ভূত শীতলতা বিরাজ করত। আপনি যদি সেইসময় সেখানে থাকার সৌভাগ্য লাভ করতেন তাহলে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনি নিশ্চিতভাবে ভুলেই যেতেন যে আপনি কোনো মরুভূমির মাঝখানে আছেন। বাগানের কাজ শেষ হলে রানি তাকে দেখে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বড় বড় গাছের ছায়া তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। চেনা ফুলের গন্ধ বহুদিন পরে তাকে আবার যেন মেদিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। রানি খোঁজও রাখেন নি এই বাগানের নীচেই কয়েক হাজার দাস বিনা পারিশ্রমিকে চাবুকের আঘাত সহ্য করে প্রায় খালি পেটে দিনের পর দিন রক্ত জল করা পরিশ্রম করে চলেছে। এভাবেই সেখানেও সভ্যতার আর সব মহান সৃষ্টির মতই ওপরে সৌন্দর্য ও রূপের আড়ালে নিচে বহু মানুষের কঠোর শ্রম ও অকথ্য নির্যাতন লুকিয়ে রাখা ছিল। ইতিহাস, আমি, আপনি সবাই যার সম্পর্কে নীরব থাকাই পছন্দ করি।

ব্যাবিলনের এই ঝোলানো বাগান কি সত্যিই ছিল? নাকি এটা মিথ? ১৮৯৯ সালে জার্মান প্রত্নতাত্বিক রবার্ট কোল্ডওয়ে ইরাকে ধ্বংসস্তূপ খনন করে ১৪ টি বড় ঘরের সন্ধান পান। কতগুলো ঘরে উনি বড় বড় গর্ত দেখেন। উনি বলেন এইগুলোই ছিল জল ধরে রাখার জায়গা। যদিও অনেকে বলেন ওগুলো শষ্য ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য রাখার জায়গা ছিল, কেউ কেউ বলেন ওগুলো ক্রীতদাসদের খাবার ঘর ছিল। সে যাই হোক আমরা আজকের দিনে এর বেশি কিছু সেই ঝোলানো বাগানের নমুনা পাই না। কালের গর্ভে সেই রাজার প্রেমের নিদর্শন কবেই হারিয়ে গেছে। তবু লোককথা ও কিছু ঐতিহাসিকদের বিবরণে তা টিঁকে আছে মিথোলজির উপাদান হয়ে আর কিছু বেঁচে আছে আধুনিক শিল্পীদের কল্পনায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *