ভারতীয় বাঘ – মিথ, প্রত্ন এবং ইতিহাস

বাঘ আমাদের জাতীয় পশু। এখনকার পৃথিবীতে যত প্রাণী জীবিত আছে রাজকীয় ঐতিহ্যে বাঘ ও সিংহের ধারেকাছে কেউ আসতে পারে না। বাঘ এমন এক প্রাণী যে সারাজীবন একা থাকে। বাঘিনী তার জীবনের বেশ কিছুটা সময় বাচ্চাদের বড় করার ক্ষেত্রে বাচ্চাদের কাছে থাকে কিন্তু বাকি সময় সেও একা বসবাস করে, শিকার ধরে এবং বেঁচে থাকে। সিংহও এক বড় হারেমের অধিপতি হয়ে জঙ্গল শাসন করে কিন্তু বাঘ তার সারা জীবন একা কাটায়। এদিক দিয়ে বিচার করলে তার মত প্রাণী জীবজগতে খুব একটা বেশি দেখা যায় না।


বাঘ শুধু আজকেই আমাদের জাতীয় পশু হয় নি। খ্রীঃপূঃ ২৫০০ সালে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই সে আমাদের জাতীয় পশু। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোয় যে বিখ্যাত পশুপতির মূর্তি পাওয়া গেছে তাতে আমরা প্রধান পশু হিসেবে বাঘের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। তাই বলা যায় সিন্ধু সভ্যতার লোকেরাও বাঘকে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হিসেবে দেখত। পরবর্তীকালে আমাদের হিন্দু পুরাণে বাঘের কথা দেখতে পাই। আমাদের তিন প্রধান দেবতার অন্যতম শিব বাঘের ছাল পরিধান করেন। সে নিয়েও পুরাণে কাহিনী আছে। আগে মহাদেব নগ্ন অবস্থায় ঘুরে বেড়াতেন। নগ্ন মহাদেবকে দেখে মর্তের ঋষিপত্নীরা পুলকিত হয়ে ওঠে। তাই দেখে ক্রুদ্ধ ঋষিরা তাদের তপোবলে এক বিরাট বাঘের সৃষ্টি করলেন মহাদেবকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু মহাদেব সেই বাঘকে মেরে তার ছাল পরিধান করলেন। সেই থেকেই তিনি বাঘের ছাল পরিধান করে থাকেন। মহিষাসুরকে হত্যা করার জন্য দেবতাদের তেজোপুঞ্জে যে দেবী দুর্গা বা অম্বিকার সৃষ্টি হল তার বাহনও বাঘ। অম্বিকা গিরিকন্যা। পাহাড়ি উপকথায় এবং উপচারে নানাভাবে অম্বিকার সাথে বাঘের উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করে থাকি।
আমাদের দাক্ষিণাত্যে সবচেয়ে দীর্ঘকাল রাজত্ব করেছিল চোলেরা। তারা প্রায় ৩০০ খ্রীঃপূঃ থেকে ১২৭৯ খ্রীঃ পর্যন্ত রাজত্ব করে। তাদের রাজকীয় প্রাণী ও প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল বাঘ। দাক্ষিণাত্যের আরেক মহান সুলতান ছিলেন টিপু। তার মত বাঘপ্রীতি ভারতের আর কোনো রাজার মধ্যে দেখা যায় নি। তার শৌর্য ও বীর্যে মুগ্ধ হয়ে ইংরেজরাই তার নাম দিয়ে ছিলেন ‘শের-ই-মহীশূর’। মহীশূরের কাছে শ্রীরঙ্গপত্তম ছিল তার রাজধানী। তিনি তার প্রাসাদেই কয়েকটি বাঘ পুষতেন। তার বাবা হায়দার আলির মৃত্যুর পর তিনি বাবার সিংহাসন বদলে বাঘের মাথার অনুকরণে এক রত্নখচিত সিংহাসন তৈরি করেন। এই টিপুই ভারতে প্রথম রকেট লঞ্চার যুদ্ধে ব্যবহার করেন। তখন ইংরেজদের কাছে সেই অস্ত্রের কোনো বিকল্প ছিল না। আরেক মহান ঐতিহাসিক সম্রাট ঘোর ইংরেজ বিদ্বেষী ২৮ বছরের নেপোলিয়ান বোনাপার্টে টিপুর মিত্র ছিলেন। তিনি টিপুকে যে চিঠি লেখেন তাতে তিনি তাকে সম্বোধন করেছিলেন এই বলে, ‘To the most magnificent Sultan, our greatest friend Tipoo saib’।
ইংরেজদের সাথে টিপুর জন্মগত বৈরিতা ছিল। ইংরেজরা তার বীরত্বকে শ্রদ্ধা করলেও তার হিংস্রতার নানা কথা লিখে গেছেন। ১৭৮০ থেকে ১৭৯০ সালের মধ্যে প্রায় তিনশর বেশি ব্রিটিশ সৈন্যদের টিপু কারাগারে বন্দী করে তাদের লিঙ্গের চামড়া কেটে ‘মহামেডান’ করে দিয়েছিলেন। ক্যাথলিক ব্রিটিশদের মধ্যে যা ছিল এক সাঙ্ঘাতিক কলঙ্ক। ১৭৯৩ সালে হেক্টর মুনরোর ছেলে সুন্দরবনের সাগরদ্বীপে বাঘের হাতে মারা যান। এই খবর পেয়ে টিপু তার ফরাসি মিত্রদের দিয়ে এক অসামান্য খেলনা তৈরি করেন যা কিনা ইতিহাসে ‘টিপুর বাঘ’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। এই কাঠের খেলনাটির ভেতরে একটি অর্গান ছিল। চাবিতে দম দিলে অর্গান থেকে বাঘের ভয়ঙ্কর গোঙানি বের হত। বাঘটি এক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশকে মাটিতে ফেলে তার ওপর চড়ে বসেছে। চাবি দিলে তার গলা কামড়ে ধরত। টিপু অবসরে সেই খেলনাটিতে চাবি দিয়ে ব্রিটিশদের প্রতি তার গায়ের জ্বালা মেটাতেন। আবার কখনও তার প্রিয় গজলও নাকি এই খেলনায় চাবি দিয়ে শুনতেন।


১৭৯৮ সালে ব্রিটিশ জেনারেল নেলসন নীলনদের যুদ্ধে নেপোলিয়ানকে পরাজিত করেন। পরের বছরই ১৭৯৯ সালে ইংরেজদের সাথে শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধে টিপু নিহত হন। দুটি বুলেট টিপুর মাথা লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। টিপুর মৃত্যুর পর তার প্রাসাদ লুঠ করে ইংরেজরা অন্যান্য ধনরত্নের সাথে তার প্রিয় খেলনাটি বিলেতে নিয়ে যান। বর্তমানে সেটি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে রাখা আছে। ইংরিজি রোমান্টিক যুগের এক অন্যতম কবি জন কীটস তার এক কবিতায় সেই ‘টিপুর বাঘ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন-


“… that little buzzing noise
Whate’er your palmistry may make of it,
Comes from a play-thing of the Emperor’s choice,
From a Man-Tiger-Organ, prettiest of the toys.”


বাঘ নিয়ে এত পুরনো কথা শোনার পর আমাদের এখনকার দিনে চোখ রাখতে হবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বাঘ ভারতে কিন্তু বেশিদিন আসে নি। তাদের মতে আজ থেকে মাত্র ১২,০০০ বছর আগে ভারতে বাঘের প্রবেশ ঘটেছে। তার আগে ভারতে বাঘ ছিল না। এর বহু বছর আগে থেকেই রাশিয়া ও চীনের উত্তরে সাইবেরিয়ায় সাইবেরিয়ান টাইগার বা ‘প্যান্থেরা টাইগ্রিস আলতাইকা’ বসবাস করত। সাইবেরিয়ায় প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগেকার বাঘের ফসিল পাওয়া গেছে। প্লেস্টোসিন যুগের শেষদিকে যখন পৃথিবীতে দীর্ঘকালীন বরফ যুগ চলছে তখন সাইবেরিয়ার অঞ্চল বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাওয়ায় কিছু বাঘেরা দক্ষিণের উষ্ণতর অঞ্চলে সরে আসে। দক্ষিণ চীন হয়ে ভারতের পূর্বদিক বরাবর তারা ভারতে প্রবেশ করে। ভারতে যে বাঘের ফসিল পাওয়া গেছে তার কোনোটারই বয়স ১১,০০০ বছরের বেশি নয়। আরেকটা মজার কথা হল শ্রীলঙ্কার লোকেরা বাঘ নিয়ে এত মাতামাতি করলেও সেখানে কিন্তু বাঘের দেখা পাওয়া যায় না। কারণ হিসেবে বলা হয় হলোসিন যুগে অর্থাৎ আজ থেকে ১১,৫০০ বছর আগে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে বহু হিমবাহ গলে যায় ও সমুদ্রস্তর বাড়তে থাকে। তাই আগে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে যে স্থলভাগের যোগসূত্র ছিল তা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তাই সবে ভারতে ঢোকা সাইবেরিয়ান টাইগার সেই সমুদ্র ডিঙ্গিয়ে শ্রীলঙ্কায় ঢুকতে পারে নি।
ভারতে যে বাঘ পাওয়া যায় বিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন বেঙ্গল টাইগার বা ইন্ডিয়ান টাইগার। মাইটোকন্ড্রিয়াল নিউক্লিওটাইড ও মাইক্রোস্যাটেলাইট পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে ভারতীয় বাঘ বা ‘প্যান্থেরা টাইগ্রিস টাইগ্রিস’ সেই সাইবেরিয়ান বাঘেরই উপপ্রজাতি। যদিও তারা আকারে কিছুটা ছোট। ক্রমেই সেই বাঘ সারা উত্তরভারত হয়ে দক্ষিণের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। আগে আমাদের বাংলার গ্রামেও বাঘ দেখা যেত। এখন শুধু সুন্দরবন ও উত্তরের কিছু পাহাড়ি এলাকা ছাড়া এদের দেখা মেলে না। ব্যপক হারে শিকার করা ও তাদের বসতি নগরায়নের ফলে সঙ্কুচিত হওয়ায় তাদের সংখ্যা ব্যপক হারে কমে গেছে। ২০১৯ সালের বাঘসুমারি অনুযায়ী আজ সারা ভারতে ২,৯৬৭টি বাঘ জীবিত আছে। যদিও সরকার অনেক অভয়ারণ্য তৈরি ও সংরক্ষণ করে বাঘের প্রজাতি রক্ষায় সক্রিয় হবার জন্যই বাঘের সংখ্যা তাও কিছু বাড়ছে।
যুগে যুগে বাঘ শিকার করাকে এক রাজকীয় ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়েছে। আবার মানুষখেকো বাঘের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করাকেও এক রাজ কর্তব্য বলে ভাবা হত। জাহাঙ্গীরের সময় মথুরার কাছে এক মানুষখেকো বাঘ সেখানকার মানুষদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। সম্রাট ও তার বেগম নুর জাহান বিরাট কনভয় নিয়ে সেখানে যান। বেগম দোদুল্যমান হাতির ওপর হাওদায় বসে দুটি মাত্র গুলি বাঘের দিকে ছুঁড়ে তাকে হত্যা করেন। আরেক বিখ্যাত সাহেব জিম করবেটের নাম আমরা কে না শুনেছি। ১৯১৮ থেকে ২৬ সালের মধ্যে কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের মধ্যে রুদ্রপ্রয়াগে এক মানুষখেকো চিতা ১২৫ জনকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল তীর্থযাত্রী। ১৯২৬ সালে জিম করবেট তাকে হত্যা করেন। যারা তার ‘রুদ্রপ্রয়াগের চিতা’ পড়েছেন তারা সকলেই সেই হাড় হিম করা চিতার সম্পর্কে অবহিত আছেন। যে আমগাছের ওপর বসে জিম সেই চিতাকে হত্যা করেন সেই আমগাছের নীচে তার স্মৃতিতে নির্মিত এক পাথরের ফলক আজও অবহেলায় অক্ষত আছে।
বাঘ মূলত জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে আত্মগোপন করে শিকার করে। তাই তার বেঁচে থাকার জন্য জঙ্গলের প্রয়োজন। একই সাথে এভাবে শিকার করার জন্য যুগে যুগে সে আমাদের মধ্যে সম্ভ্রম মিশ্রিত ভয়ের সৃষ্টি করে এসেছে। সাহস ও শৌর্যের উদাহরণ বলতে আমরা এখনও বাঘকেই বুঝি। আমাদের দেশ ছাড়া আর মাত্র পাঁচটি দেশে এই প্রাণীটি কোনোক্রমে টিকে আছে। আমাদের সকলেরই দায়িত্ব আছে যাতে তারা তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে স্যাবার টুথড টাইগার বা আমেরিকান কেভ টাইগারের মত সম্পূর্ণ মিথ বা ঐতিহাসিক প্রাণী না হয়ে যায়।

( চলবে )

4 thoughts on “ভারতীয় বাঘ – মিথ, প্রত্ন এবং ইতিহাস

  • August 1, 2020 at 7:22 pm
    Permalink

    সহজ সরল এবং হৃদয়গ্রাহী।

    Reply
    • August 2, 2020 at 7:59 am
      Permalink

      ধন্যবাদ,ভাস্করদা।

      Reply
  • August 1, 2020 at 7:23 pm
    Permalink

    সহজ সরল এবং হৃদয়গ্রাহী।

    Reply
    • August 1, 2020 at 7:24 pm
      Permalink

      সুন্দর।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *